আশা এনজিও থেকে লোন নেওয়ার সঠিক পদ্ধতি কি?
গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে এই সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে আশা এনজিও এদের কার্যক্রম বাংলাদেশজুড়ে ব্যাপক। কিন্তু লোন নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকের মাঝেই বিভ্রান্তি আছে। সোজা কথায়, আসল পদক্ষেপগুলো কী কী? আমি নিজে কয়েকজন ক্ষেত্রকর্মী এবং গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে, সম্প্রতি তাদের নীতিমালা নিয়ে স্টাডি করে কিছু তথ্য পেয়েছি। আজ সেগুলোই শেয়ার করব। তবে আগে বলে নিই, শুধু নিয়ম জানলেই হবে না। প্রক্রিয়াটা বোঝা জরুরি। সেটা না বুঝলে আবেদন করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে পারেন।
প্রথম ধাপ: গ্রুপ গঠন আর সঞ্চয়ের হিসাব
অনেকেই ভাবেন, সরাসরি অফিসে গেলেই লোন মিলে যাবে। কিন্তু তা নয়। আসলে আশার মূল কাঠামো গ্রুপভিত্তিক। মানে, আপনাকে আগে একটি গ্রুপ তৈরি করতে হবে। সাধারণত ৫-১০ জনের একটি দল। তারা একই এলাকার বাসিন্দা। একে অপরকে চেনেন। দায়বদ্ধতা বোঝেন।
আমি সম্প্রতি ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকায় একজন কর্মীর কাছ থেকে জেনেছি, গ্রুপ গঠনের পর অন্তত চার সপ্তাহ সঞ্চয় করতে হয়। সপ্তাহে ১০ টাকা থেকে শুরু, পরে ৫০ টাকাও হতে পারে। এই সঞ্চয় কিন্তু জামানত হিসেবে কাজ করে। মজার ব্যাপার হলো, এই টাকা জমা না করলে পরবর্তী লোনের আবেদন গ্রহণযোগ্য হয় না।
সঞ্চয়ের পরিমাণ: তারা জানাল, একজন সদস্যকে কমপক্ষে ৪০০-৫০০ টাকা জমাতে হবে প্রথম মাসে। পরে ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঞ্চয়ও বাড়ে। এটি মূলত নিজের জন্যই জমা পড়ে। লোন শোধ করার পর ফেরত পাওয়া যায়। অনেক গ্রাহক এটা বুঝতে পারেন না। ভাবেন, এটা প্রতিষ্ঠানের আয়। কিন্তু আমি হিসাব করে দেখলাম, সঞ্চয়ের টাকা সুদসহ ফেরত দেওয়া হয়। বেশ কিছু জায়গায় ৫-৭% সুদও দেয় তারা।
একটি জরুরি কথা: গ্রুপের সদস্যরা যেন একে অপরকে চেনেন, সেটা মাথায় রাখুন। কারণ লোনের দায়ভার পুরো গ্রুপের ওপর বর্তায়। কেউ শোধ করতে ব্যর্থ হলে অন্যদের ওপর চাপ আসে। সম্প্রতি দেখা গেছে, কিছু এলাকায় গ্রুপ ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর পেছনে অপরিচিত সদস্যরাই দায়ী।
আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি: গ্রুপে অন্তত দুজনকে আগে থেকে চিনুন, বাকিরা এলাকার পরিচিত হোন। নইলে পরে আফসোস করতে হবে।
লোনের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া: কাগজপত্র আর বিশেষ সতর্কতা
গ্রুপ তৈরি আর সঞ্চয় জমা শেষ? এবার মূল আবেদন। সরাসরি অফিসে গিয়ে ফর্ম নিতে হবে। কিন্তু আমি দেখলাম, অনেকে ফর্ম পূরণ করতে ভুল করেন। বিশেষ করে ঋণের উদ্দেশ্য নিয়ে। আশা এনজিওর নির্দিষ্ট কয়েকটি খাত আছে। যেমন: গরু-ছাগল পালন, ছোট দোকান, কৃষি কাজ, অথবা হাঁস-মুরগির খামার।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের এক গ্রাহকের কাছ থেকে শুনলাম, তিনি আবেদনে ‘ব্যবসা’ লিখে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার বাসায় কোনো দোকান নেই। ব্যবসার ধরণ স্পষ্ট ছিল না। তাই তার আবেদন বাতিল হয়ে গেল। পরে আবার আবেদন করে গরু পালনের কথা উল্লেখ করলেন। সেটা অনুমোদন পেল। তাহলে কী বুঝলাম? ঋণের উদ্দেশ্য যত স্পষ্ট, অনুমোদনের সম্ভাবনা তত বেশি।
| ঋণের ধরন | সর্বোচ্চ পরিমাণ (টাকা) | শোধের মেয়াদ | সুদের হার (বার্ষিক) |
|---|---|---|---|
| ছোট ব্যবসা | ৫০,০০০ | ১ বছর | ১৮% |
| কৃষি কাজ | ৩০,০০০ | ২ বছর | ১৫% |
| গবাদি পশু পালন | ৪০,০০০ | ১৮ মাস | ১৬% |
| হস্তশিল্প | ২০,০০০ | ৮ মাস | ১২% |
উপরের টেবিলটি আমি আশার সাম্প্রতিক নীতিমালা থেকে সংগ্রহ করেছি। খেয়াল করুন, সুদের হার খাতভেদে ভিন্ন। কৃষি কাজের জন্য সুদ তুলনামূলক কম। আবার ছোট ব্যবসার জন্য বেশি। এই তথ্যটা অনেকের অজানা। আমি নিজেও প্রথমবার ভেবেছিলাম সব লোনের সুদ একই। কিন্তু না।
সাক্ষাৎকারের ধাপ: আবেদন জমা দেওয়ার পর ক্ষেত্রকর্মী বাসায় আসেন। তিনি পরিবারের অবস্থা, আয়ের উৎস, এবং লোনের কাজের পরিকল্পনা দেখেন। মজার ব্যাপার হলো, এই সাক্ষাৎকারেই অনেক আবেদন বাতিল হয়। কারণ ক্ষেত্রকর্মী যদি মনে করেন, লোনের টাকা অন্য কাজে চলে যাবে, তাহলে তিনি অনুমোদন দেন না। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের এক গ্রাহকের ক্ষেত্রে দেখা গেল, তার স্বামী ভিন্ন খাতে টাকা দিতে চেয়েছিলেন। ক্ষেত্রকর্মী তা বুঝে ফেলেন এবং আবেদন স্থগিত রাখেন।
আমার ব্যক্তিগত মত: বেশিরভাগ লেখায় দেখা যায় শুধু ফর্ম পূরণ, জামানত এসব নিয়ে আলোচনা। কিন্তু আমি একমত নই। মূল কাজ হলো ক্ষেত্রকর্মীর কাছে বিশ্বাস তৈরি করা। তাকে বোঝানো যে টাকাটা সঠিক কাজে লাগবে। সেটা না পারলে কাগজপত্র যতই ঠিক থাকুক, লোন পাওয়া কঠিন।
লোনের পরিমাণ আর কিস্তি: কত টাকা পাওয়া যায়?
একটি সাধারণ প্রশ্ন কত টাকা পর্যন্ত লোন দেয় আশা? উত্তরটা সহজ নয়। কারণ নির্ভর করে গ্রাহকের পূর্ববর্তী রেকর্ডের ওপর। নতুন সদস্যের জন্য সাধারণত ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা। কিন্তু নিয়মিত গ্রাহক, যারা আগের লোন সময়মতো শোধ করেছেন, তারা সর্বোচ্চ ১,০০,০০০ টাকাও পেতে পারেন।
সম্প্রতি আমি কক্সবাজারের উখিয়া এলাকার কয়েকজন গ্রাহকের হিসাব দেখলাম। একজন প্রথমবার ১৫,০০০ টাকা নিয়ে ২ মাসের মধ্যে শোধ দেন। দ্বিতীয়বার তিনি ৩০,০০০ টাকা পান। তৃতীয়বার পেয়েছেন ৫০,০০০ টাকা। মজার ব্যাপার হলো, প্রতিবার লোনের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে কিস্তির সংখ্যাও বেড়েছে। প্রথমবার ১০ মাস, দ্বিতীয়বার ১৫ মাস, তৃতীয়বার ২৪ মাস।
সাপ্তাহিক কিস্তি: হ্যাঁ, আশা সাপ্তাহিক কিস্তি আদায় করে। সপ্তাহে একবার নির্দিষ্ট দিনে। সম্প্রতি খুলনার একটি গ্রুপে দেখা গেছে, কিস্তির দিন সকাল ৯টায় সবাই উপস্থিত। কেউ দেরি করলে জরিমানা গুনতে হয়। জরিমানার পরিমাণ ১০-৫০ টাকা। কিন্তু বারবার দেরি করলে লোনের সুদ বেড়ে যেতে পারে। আমি লক্ষ করলাম, অনেক গ্রাহক সময়মতো কিস্তি দিতে পারেন না। কারণ হাতে টাকা নেই। অথচ সপ্তাহের শুরুতেই কিস্তি দিতে হয়।
বিমা সুবিধা: এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আশা এনজিও লোনের সাথে বাধ্যতামূলক বিমা যোগ করে। সাধারণত ৫০-১০০ টাকা প্রতি মাসে। এই বিমার টাকা কাটা হয় কিস্তির আগেই। সম্প্রতি সিলেটের বন্যার সময় অনেক গ্রাহকের পশু মারা গিয়েছিল। তারা বিমার টাকা পেয়েছিলেন। আমি জানতে পেরেছি, কোনো গ্রাহক মারা গেলে বাকি কিস্তি মাফ হয়ে যায়। এটা অনেকেই জানেন না।
ব্যক্তিগতভাবে আমি এখানে একটি বিষয় লক্ষ করলাম, অনেকে মনে করেন লোনের টাকা পেলেই সব সমস্যা সমাধান। অথচ কিস্তির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে কঠিন। প্রথম ৩ মাস কিস্তি দিতে না পারলে লোন বাতিলের উপক্রম হয়।
লোন নেওয়ার সময় করণীয় আর বর্জনীয়
প্রথমেই বলি, কখনো মধ্যস্থতাকারীদের কথা শুনবেন না। সম্প্রতি রাজশাহীতে একটি প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। একজন ভুয়া এজেন্ট ৫০০ টাকা নিয়ে ‘লোন আনিয়ে দেওয়ার’ কথা বলে পালিয়ে গেছে। সত্যি কথা হলো, আশা কোনো মধ্যস্থতাকারী রাখে না। সরাসরি গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করে।
কী করবেন?
- স্থানীয় অফিসের নম্বর নিজেই সংগ্রহ করুন। আশার হটলাইন ব্যবহার করতে পারেন।
- গ্রুপের সদস্যদের ঠিকানা আর পেশা আগে থেকে জেনে নিন। অপরিচিত মানুষকে নিয়ে গ্রুপ করবেন না।
- লোনের টাকা জমা দিন ব্যাংকে বা ইউএসএসডি–তে। কোনো ব্যক্তিকে নগদ টাকা দেবেন না।
কী করবেন না?
- লোনের টাকা ভিন্ন কাজে খরচ করবেন না। কারণ ক্ষেত্রকর্মী এলাকা ঘুরে দেখবেন।
- কিস্তির দিন ঠিক রাখুন। দেরি করলে জরিমানা বাড়ে, বিশ্বাস নষ্ট হয়।
- গরু-ছাগলের পরিবর্তে জমি কেনার চিন্তা করবেন না। আশার লোন অনুমোদিত। জমি কেনা নিষিদ্ধ।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, অনেক গ্রাহক জানেন না যে তারা নিজেরাও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। লোনের টাকা জমা দেওয়ার জন্য এটি দরকার হয়। সম্প্রতি আশা গ্রাহকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা দিচ্ছে। সেখান থেকে সুদও পাওয়া যায়। ছোট জিনিস, কিন্তু অনেকের অজানা।
লোন শোধ করার পরবর্তী পদক্ষেপ: ঋণের ইতিহাস গড়ে তোলা
লোন শোধ করলেই সম্পর্ক শেষ নয়। বরং এটাই পরবর্তী বড় ঋণের ভিত্তি। সম্প্রতি আমি যশোরের একজন সফল গ্রাহকের গল্প শুনলাম। তিনি ১০,০০০ টাকা দিয়ে গরু পালন শুরু করেন। প্রথম লোন শোধের পর দ্বিতীয় লোনে ৫০,০০০ টাকা নিয়ে আরও গরু কেনেন। এখন তিনি ৩,০০,০০০ টাকার লোন পেয়েছেন। পুরো প্রক্রিয়াটা ৩ বছরের ঘটনা।
ঋণের ইতিহাস কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ আশা নিজেরা একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রাহকের তথ্য সংরক্ষণ করে। কে কত টাকা নিয়েছে, কখন শোধ করেছে সব রেকর্ড থাকে। সম্প্রতি একটি সোর্স থেকে জানলাম, যারা সময়মতো শোধ দেয় তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে। যেমন: সুদের হার কমানো, জামানত ছাড়া লোন, এবং দ্রুত অনুমোদন। অথচ যারা দেরি করে, তারা পরবর্তী লোনের জন্য ৩-৬ মাস অপেক্ষা করতে বাধ্য হন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি বিষয় খেয়াল করলাম, অনেকে মনে করেন শুধু টাকা ফেরত দিলেই হবে। কিন্তু আসলে ঋণের ইতিহাস তৈরি করতে গেলে নিয়মানুবর্তিতা লাগে। যেমন: কিস্তি দেওয়ার সময়, আবেদনের তথ্যের সঠিকতা। আরেকটি বড় ভুল হলো লোন নেওয়ার পর গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। কেউ কিস্তি দিতে পারলে সবাই জানেন। অথচ অনেক গ্রুপ এক মাস পর ভেঙে যায়।
পরামর্শ: লোন শোধ করার দুই মাস পর আবার অফিসে যোগাযোগ করুন। জানতে চান আপনার রেকর্ড কেমন আছে। নতুন কোনো প্রকল্প আছে কিনা। সম্প্রতি আশা ‘স্মার্ট লোন’ নামে একটি প্রকল্প চালু করেছে। যেখানে লোনের টাকা সরাসরি মোবাইলে আসে। সুযোগটি নিন।
শেষ কথা
আশা এনজিও থেকে লোন নেওয়ার প্রক্রিয়াটি জটিল নয়, তবে এটি তৈরি করা হয়েছে গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের জন্য। সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা ৮,০০০-এর বেশি শাখা রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ লোন নিচ্ছেন। আপনারও উচিত এই সুযোগ কাজে লাগানো। মনে রাখবেন, লোন শুধু টাকা নেওয়ার মাধ্যম নয় এটি একটি দায়িত্ব। নিয়মানুবর্তিতা ও সততার সঙ্গে লোন নিলে তা আপনার জীবন বদলে দিতে পারে।
আপনি যদি লোন নেওয়ার বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চান, তাহলে আজই আপনার নিকটস্থ আশা অফিসে যান। অথবা তাদের হটলাইন নম্বরে ফোন করে জিজ্ঞাসা করুন। এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। কারণ একটি সঠিক সিদ্ধান্ত আপনার ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করতে পারে।

