এনজিওর গঠনতন্ত্র তৈরির নিয়ম কি?
একটি এনজিও প্রতিষ্ঠার সময় নাম নির্বাচন, সদস্য সংগ্রহ বা নিবন্ধনের আবেদন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি সঠিক ও বাস্তবসম্মত গঠনতন্ত্র তৈরি করা। গঠনতন্ত্র শুধু নিবন্ধনের সঙ্গে জমা দেওয়ার একটি কাগজ নয়। সংস্থার উদ্দেশ্য কী হবে, কে সদস্য হতে পারবেন, কমিটি কীভাবে গঠিত হবে, অর্থ কীভাবে পরিচালিত হবে এবং কোনো বিরোধ দেখা দিলে সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে এসব বিষয়ের মূল ভিত্তি হলো গঠনতন্ত্র।
বাংলাদেশে সব ধরনের বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের জন্য একই নিবন্ধন পদ্ধতি নেই। সমাজকল্যাণমূলক সংস্থার ক্ষেত্রে সমাজসেবা অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ। আবার বৈদেশিক অনুদান নিয়ে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নিয়মও প্রযোজ্য হতে পারে। তাই অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্র হুবহু নকল না করে নিজের সংস্থার উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ অনুযায়ী এটি তৈরি করাই নিরাপদ পদ্ধতি।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিষ্ক্রিয় থাকা বা গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কার্যক্রম পরিচালনাসহ বিভিন্ন কারণে অনেক নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থা বিলুপ্ত হয়েছে। তাই নিবন্ধনের সময় গঠনতন্ত্র তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; নিবন্ধনের পর সংস্থার কার্যক্রমও অনুমোদিত গঠনতন্ত্র ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনা করা জরুরি।
গঠনতন্ত্র তৈরির আগে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করুন
প্রথমে নির্ধারণ করুন আপনার প্রতিষ্ঠান কোন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং সেই কার্যক্রম কোন নিবন্ধন কাঠামোর আওতায় পড়ে। শিশু কল্যাণ, যুব কল্যাণ, নারী কল্যাণ, বয়স্ক ও অসহায় মানুষের সহায়তা, সামাজিক শিক্ষা বা অন্যান্য সমাজকল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন প্রযোজ্য হতে পারে। অন্যদিকে বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ করে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন, ২০১৬ এবং ২০২৬ সালের সংশোধন অনুযায়ী এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধন প্রয়োজন। এ নিবন্ধন ও নবায়ন সনদের মেয়াদ ১০ বছর।
এনজিওর গঠনতন্ত্রে কোন কোন বিষয় থাকতে হবে?
স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকাশিত নিবন্ধন নির্দেশনা অনুযায়ী গঠনতন্ত্রে সংস্থার পরিচয়, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, সদস্যপদ, পরিচালনা কাঠামো, সভা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, গঠনতন্ত্র সংশোধন এবং বিলুপ্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত। বাস্তবে একটি পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্রে নিচের বিষয়গুলো রাখা কার্যকর।
- সংস্থার নাম: নামের বানান, পূর্ণরূপ এবং প্রয়োজন হলে সংক্ষিপ্ত নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
- কার্যএলাকা: সংস্থা একটি উপজেলা, জেলা, একাধিক জেলা নাকি দেশব্যাপী কাজ করবে তা নির্দিষ্ট করতে হবে।
- প্রধান কার্যালয়: সংস্থার প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা বা অবস্থান উল্লেখ করতে হবে।
- লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: সংস্থাটি কোন জনগোষ্ঠীর জন্য কী ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজ করবে তা পরিষ্কার ভাষায় লিখতে হবে।
- সদস্যপদ: সদস্য হওয়ার যোগ্যতা, সদস্যের ধরন, ভর্তি পদ্ধতি, অধিকার, দায়িত্ব এবং সদস্যপদ বাতিল বা পুনর্বহালের নিয়ম থাকতে হবে।
- শাখা কার্যালয়: শাখা থাকলে তার ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং অনুমোদন প্রত্যাহারের পদ্ধতি উল্লেখ করতে হবে।
- সাংগঠনিক কাঠামো: সাধারণ পরিষদ, কার্যনির্বাহী পরিষদ, পদাধিকারীদের নির্বাচন, মেয়াদ, ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।
- সভা পরিচালনা: সাধারণ সভা ও কার্যনির্বাহী সভা আহ্বান, নোটিশ এবং কোরামের নিয়ম থাকতে হবে।
- আর্থিক ব্যবস্থাপনা: ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, অর্থ উত্তোলনের ক্ষমতা, হিসাব সংরক্ষণ এবং নিরীক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে।
- গঠনতন্ত্র সংশোধন: ভবিষ্যতে কোনো ধারা পরিবর্তনের প্রস্তাব, অনুমোদন এবং নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের সম্মতি নেওয়ার পদ্ধতি উল্লেখ করতে হবে।
- সংস্থা বিলুপ্তি: সংস্থা বিলুপ্ত করার প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত এবং ঋণ ও দায় পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ বা সম্পদের ব্যবস্থাপনা প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী কীভাবে হবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
নাম, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ধারা কীভাবে লিখবেন?
গঠনতন্ত্রের উদ্দেশ্য অংশে অস্পষ্ট বা সীমাহীন বক্তব্য না লেখাই ভালো। যেমন শুধু “মানবতার সেবা করা” বলার পরিবর্তে কোন জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসচেতনতা, দক্ষতা উন্নয়ন, পুনর্বাসন বা সামাজিক সহায়তা দেওয়া হবে তা উল্লেখ করা উচিত। উদ্দেশ্যের সঙ্গে পরবর্তী বাস্তব কার্যক্রমের মিল থাকা জরুরি। একই সঙ্গে এমন কোনো উদ্দেশ্য রাখা উচিত নয় যা প্রতিষ্ঠানের অলাভজনক ও জনকল্যাণমূলক চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সদস্যপদ ও কার্যনির্বাহী পরিষদের নিয়ম
অনেক গঠনতন্ত্রে সবচেয়ে বেশি অস্পষ্টতা দেখা যায় সদস্যপদ ও কমিটি গঠনের ধারায়। কারা সাধারণ সদস্য হতে পারবেন, সদস্য হওয়ার আবেদন কে অনুমোদন করবে, সদস্য ফি থাকলে তার নিয়ম কী হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিল হতে পারে এসব পরিষ্কার করতে হবে। কাউকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সদস্যপদ বাতিল করার মতো অস্পষ্ট ধারা পরবর্তীতে বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। কার্যনির্বাহী পরিষদের ক্ষেত্রেও সভাপতি, সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষসহ প্রতিটি পদের ক্ষমতা আলাদাভাবে লিখলে জবাবদিহি বাড়ে।
সভা, কোরাম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি
একটি কার্যকর গঠনতন্ত্রে বছরে কতবার সাধারণ সভা হবে, কার্যনির্বাহী পরিষদ কত সময় পরপর সভা করবে, কতদিন আগে নোটিশ দিতে হবে এবং কতজন সদস্য উপস্থিত থাকলে কোরাম পূর্ণ হবে তা পরিষ্কার থাকা দরকার। সমান ভোট হলে কীভাবে সিদ্ধান্ত হবে, জরুরি সভা কে আহ্বান করতে পারবেন এবং সভার কার্যবিবরণী কোথায় সংরক্ষণ করা হবে তাও উল্লেখ করা ভালো। এ ধরনের নিয়ম আগে থেকেই নির্ধারিত থাকলে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ কমে যায়।
আর্থিক ব্যবস্থাপনার ধারা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
১৯৬১ সালের প্রযোজ্য অধ্যাদেশ অনুযায়ী নিবন্ধিত সংস্থাকে নিরীক্ষিত হিসাব রাখতে হয় এবং প্রতিষ্ঠানের নামে পৃথক ব্যাংক হিসাবে প্রাপ্ত অর্থ জমা রাখতে হয়। তাই গঠনতন্ত্রে ব্যাংক হিসাব কারা যৌথভাবে পরিচালনা করবেন, অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন কীভাবে হবে এবং হিসাব বছরের শেষে নিরীক্ষা কীভাবে সম্পন্ন হবে তা উল্লেখ করা উচিত। হিসাবরক্ষণে নগদ বই, খতিয়ান, আয়-ব্যয়ের হিসাব, সদস্য নিবন্ধন এবং সভার কার্যবিবরণী সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
গঠনতন্ত্র সংশোধনের নিয়ম
নিবন্ধনের পর কার্যনির্বাহী পরিষদ নিজের সিদ্ধান্তে গঠনতন্ত্রের ধারা পরিবর্তন করে তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করতে পারে না। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন নিবন্ধিত সংস্থার ক্ষেত্রে সংশোধিত গঠনতন্ত্র নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়া জরুরি। সাধারণত সাধারণ সভায় সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করে সংশ্লিষ্ট নথি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হয়। বৈদেশিক অনুদান গ্রহণকারী এনজিওর ক্ষেত্রে প্রাথমিক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নির্দেশনাও অনুসরণ করতে হয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরে গঠনতন্ত্র জমা দেওয়ার বর্তমান নিয়ম
সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথমে সংস্থার নামের ছাড়পত্র নিতে হয় এবং নতুন সংস্থার নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরম-বি ব্যবহার করতে হয়। আবেদনের সঙ্গে বাংলায় তৈরি গঠনতন্ত্রের ৫ কপি জমা দিতে হয় এবং প্রতিটি পৃষ্ঠায় সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর থাকতে হয়। গঠনতন্ত্র প্রণয়নসংক্রান্ত সভার সত্যায়িত কার্যবিবরণীও জমা দিতে হয়। বর্তমানে প্রকাশিত নির্দেশনায় নিবন্ধন ফি ৫,০০০ টাকা এবং মূল্য সংযোজন কর ৭৫০ টাকা উল্লেখ রয়েছে। আবেদন জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সর্বশেষ নির্দেশনা এবং অর্থ জমার নির্ধারিত খাত যাচাই করা উচিত।
গঠনতন্ত্র তৈরিতে যেসব ভুল এড়ানো জরুরি
অন্য প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্র কপি করে শুধু নাম পরিবর্তন করা সাধারণ ভুলগুলোর একটি। এতে কার্যএলাকা, কমিটির মেয়াদ, সদস্যসংখ্যা বা আর্থিক নিয়মে পরস্পরবিরোধী ধারা থেকে যেতে পারে। এক ধারায় দুই বছরের কমিটির মেয়াদ এবং অন্য ধারায় তিন বছর লেখা থাকলেও সমস্যা তৈরি হয়। ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, কোরাম, পদ শূন্য হলে করণীয়, সদস্য অপসারণ, গঠনতন্ত্র সংশোধন এবং সংস্থা বিলুপ্তির নিয়ম স্পষ্ট রাখতে হবে। ১৯৬১ সালের প্রযোজ্য অধ্যাদেশ অনুযায়ী নিবন্ধিত সংস্থার পরিচালনা পরিষদ বা সদস্যরা নিজের সিদ্ধান্তে সরাসরি সংস্থা বিলুপ্ত করতে পারেন না; অন্তত তিন-পঞ্চমাংশ সদস্য সরকারের কাছে বিলুপ্তির আবেদন করতে পারেন। সংস্থা বিলুপ্ত হলে ঋণ ও দায় পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ, সিকিউরিটি বা সম্পদ সদস্যদের মধ্যে ভাগ করার বিধান রাখা উচিত নয়; সরকার তা অনুরূপ উদ্দেশ্যের অন্য সংস্থায় স্থানান্তরের নির্দেশ দিতে পারে।
একটি বাস্তবসম্মত গঠনতন্ত্র তৈরির কার্যকর পদ্ধতি
প্রথমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, উপকারভোগী জনগোষ্ঠী ও কার্যএলাকা এক পাতায় লিখে নিন। এরপর সদস্যপদ, সাধারণ পরিষদ, কার্যনির্বাহী পরিষদ, পদাধিকারীদের ক্ষমতা, সভা, অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং সংশোধনের ধারাগুলো সাজান। সব ধারা তৈরি হওয়ার পর একটি ধারা অন্য ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না পরীক্ষা করুন। তারপর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের সভায় খসড়াটি আলোচনা করে অনুমোদন করুন এবং সভার কার্যবিবরণী সংরক্ষণ করুন। সবশেষে যে কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন করবেন, তাদের সর্বশেষ নির্দেশিকার সঙ্গে গঠনতন্ত্র মিলিয়ে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
এনজিওর গঠনতন্ত্র নিয়ে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
১. এনজিওর গঠনতন্ত্র কি বাংলায় তৈরি করতে হয়?
সমাজসেবা অধিদপ্তরের বর্তমান নিবন্ধন নির্দেশনায় বাংলায় তৈরি গঠনতন্ত্র জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাদের নির্দেশনায় গঠনতন্ত্রের ৫ কপি এবং প্রতি পৃষ্ঠায় সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরের কথাও রয়েছে। অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন হলে তাদের আলাদা নির্দেশনা আগে যাচাই করা উচিত।
২. নিজেরাই কি এনজিওর গঠনতন্ত্র তৈরি করা যায়?
হ্যাঁ, প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা প্রযোজ্য আইন ও সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করে গঠনতন্ত্র তৈরি করতে পারেন। তবে জটিল সাংগঠনিক কাঠামো, বড় তহবিল বা একাধিক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ জড়িত থাকলে চূড়ান্ত জমা দেওয়ার আগে অভিজ্ঞ আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে নথি যাচাই করানো সহায়ক হতে পারে।
৩. গঠনতন্ত্রে কতজন সদস্য রাখতে হবে?
সব ধরনের এনজিওর জন্য একটি অভিন্ন সদস্যসংখ্যা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সদস্যসংখ্যা সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত হতে পারে। তাই ইন্টারনেট থেকে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা কপি করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে সদস্য কাঠামো নির্ধারণ করা উচিত।
৪. সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মেয়াদ কত বছর হবে?
গঠনতন্ত্রে কার্যনির্বাহী পরিষদের মেয়াদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। তবে সব এনজিওর জন্য একটি অভিন্ন মেয়াদ ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। যে মেয়াদ নির্ধারণ করা হবে, নির্বাচন, দায়িত্ব হস্তান্তর এবং নতুন পরিষদ গঠনের সব ধারায় একই মেয়াদ ব্যবহার করতে হবে।
৫. নিবন্ধনের পরে গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করা যায় কি?
পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু সংশ্লিষ্ট অনুমোদন ছাড়া পরিবর্তিত ধারা কার্যকর ধরে নেওয়া উচিত নয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন নিবন্ধিত সংস্থার গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত ও সংশোধিত ধারার নথিও সংরক্ষণ করতে হয়।
৬. গঠনতন্ত্রে ব্যাংক হিসাব পরিচালনার নিয়ম থাকা দরকার কি?
অবশ্যই রাখা উচিত। কোন পদাধিকারীরা যৌথভাবে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করবেন, অর্থ উত্তোলনে কতজনের স্বাক্ষর লাগবে এবং ব্যয়ের অনুমোদন কীভাবে হবে তা লিখলে আর্থিক জবাবদিহি পরিষ্কার হয়। নিবন্ধিত সংস্থার অর্থ প্রতিষ্ঠানের নামে পৃথক হিসাবে রাখার আইনি বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
৭. সব এনজিওকে কি এনজিও বিষয়ক ব্যুরোতে নিবন্ধন করতে হয়?
না। এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর ভূমিকা বিশেষভাবে বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ করে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি স্থানীয় সমাজকল্যাণ সংস্থার প্রাথমিক নিবন্ধন অন্য কর্তৃপক্ষের অধীনে হতে পারে। ভবিষ্যতে বৈদেশিক অনুদান গ্রহণের পরিকল্পনা থাকলে ব্যুরোর প্রযোজ্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
৮. বৈদেশিক অনুদান গ্রহণের জন্য শুধু সাধারণ নিবন্ধন যথেষ্ট কি?
বর্তমান সংশোধিত আইন অনুযায়ী কোনো সংস্থা বা এনজিও বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ করে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধনের বিধান প্রযোজ্য। তাই শুধু প্রাথমিক নিবন্ধন সনদ থাকলেই বৈদেশিক অনুদান পরিচালনার সব আইনি প্রয়োজন পূরণ হয়েছে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
৯. এনজিও বিলুপ্ত হলে সম্পদ কি সদস্যরা ভাগ করে নিতে পারবেন?
গঠনতন্ত্রে এমন বিধান রাখা উচিত নয়। প্রযোজ্য অধ্যাদেশ অনুযায়ী সংস্থা বিলুপ্ত হলে ঋণ ও দায় পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ, সম্পদ বা সিকিউরিটি অনুরূপ উদ্দেশ্যে কাজ করা অন্য সংস্থায় স্থানান্তরের ব্যবস্থা সরকার করতে পারে। তাই বিলুপ্তির ধারা জনকল্যাণমূলক চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি।
১০. গঠনতন্ত্র ও উপবিধি কি একই বিষয়?
দুটির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও কাজ এক নয়। গঠনতন্ত্র হলো প্রতিষ্ঠানের মৌলিক পরিচালন কাঠামো, যেখানে উদ্দেশ্য, সদস্যপদ, কমিটি, ক্ষমতা ও আর্থিক ব্যবস্থার মূল নিয়ম থাকে। উপবিধিতে দৈনন্দিন প্রশাসনের আরও বিস্তারিত পদ্ধতি থাকতে পারে। তবে কোনো উপবিধি গঠনতন্ত্র বা প্রযোজ্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়া উচিত নয়।
উপসংহার
এনজিওর গঠনতন্ত্র তৈরির মূলনীতি হলো স্পষ্টতা, আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং বাস্তবে অনুসরণ করা সম্ভব এমন নিয়ম তৈরি করা। নাম ও উদ্দেশ্য থেকে শুরু করে সদস্যপদ, কমিটি, সভা, ব্যাংক হিসাব, নিরীক্ষা, সংশোধন ও বিলুপ্তি পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আগেই নির্ধারণ করলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক বিরোধ ও নিবন্ধনসংক্রান্ত সমস্যা অনেকটাই কমানো যায়। গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

