গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে দিশা এনজিওর লোন প্রোগ্রাম বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু সঠিক পদ্ধতি না জানলে আবেদন করাটা জটিল হয়ে যায়। আমি সম্প্রতি তাদের সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করেছি। বেশ কিছু পরিবর্তন চোখে পড়েছে। ধরুন, প্রক্রিয়াটা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে, কিন্তু কিছু শর্ত কঠোরও হয়েছে। আচ্ছা, শুরু করা যাক।
বর্তমান আবেদন প্রক্রিয়া কেমন: সহজকরণের গল্প
আমি যখন প্রথম দিশার লোন পদ্ধতি নিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করি, পুরনো নিয়মগুলো বেশ জটিল ছিল। কিন্তু এখন? অবাক লাগলো। সম্প্রতি তাদের ওয়েবসাইট ও ফিল্ড অফিসের তথ্য এক করে দেখলাম। প্রক্রিয়াটা তিনটি সহজ ধাপে ভাগ হয়ে গেছে। প্রথমত, স্থানীয় শাখায় গিয়ে একটি প্রাথমিক ফর্ম পূরণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দলগত সভায় অংশ নেওয়া এটা বাধ্যতামূলক। তৃতীয়ত, শাখা ব্যবস্থাপকের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার।
বেশিরভাগ লোক মনে করে কেবল কাগজপত্র জমা দিলেই হয়। আমি একমত নই। কারণ, সঠিক উপস্থাপনাই আসল কথা। আমি এক জায়গায় দেখলাম, যারা সভায় নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন, তাদের লোন অনুমোদনের হার ছিল ৮৫%। অথচ যারা শুধু ফর্ম জমা দিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, তাদের হার মাত্র ৪২%। পার্থক্যটা বিশাল। তাই সভায় যাওয়াটা জরুরি। যাই হোক, আবেদনের সময় যে বিষয়টি মাথায় রাখার: কোনও ফি নেই আবেদনের জন্য। বর্তমান নিয়মে গ্রুপের কমপক্ষে পাঁচ সদস্য থাকলেই লোনের যোগ্যতা পাওয়া যায়।
আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি: প্রথম সপ্তাহে শাখায় গিয়ে ফর্ম সংগ্রহ করে পরের সপ্তাহেই সভায় অংশ নিন। এভাবে সময় বাঁচে এবং প্রক্রিয়াও দ্রুত হয়।
যে কাগজপত্র ছাড়া আবেদন অসম্পূর্ণ: নামযুক্ত তালিকা
সততার সাথে বলছি, কাগজপত্র কম হলেও কিছু নির্দিষ্ট নথি ছাড়া কাজ হয় না। আমি বিভিন্ন শাখার তালিকা মিলিয়ে দেখলাম। নিচের ছকের মতো নথি থাকা জরুরি।
| নথির নাম | বিবরণ | প্রয়োজনীয়তা |
|---|---|---|
| জাতীয় পরিচয়পত্র | মূল কপি ও ফটোকপি | বাধ্যতামূলক |
| গ্রুপ সদস্য তালিকা | সকল সদস্যের ঠিকানা ও এনআইডি | বাধ্যতামূলক |
| আয়ের প্রমাণ | পেশা বা ব্যবসার বিবরণ | জরুরি |
| জমির দলিল (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) | নামমাত্র কপি | প্রয়োজন |
| ছবি (৩০x২৫ মিমি) | সাম্প্রতিক রঙিন ছবি | অপরিহার্য |
নথি জমা দেওয়ার সময় একটি ভুল প্রায়ই হয় অনেকে আসল কপি নিয়ে যান না। দেখুন না, তারা শুধু ফটোকপি দেন। অথচ শাখা থেকে আসল কপি মিলিয়ে নেওয়ার কথা। আমার কাছে একটি ঘটনা জানা গেল এক আবেদনকারী শুধু ফটোকপি দিয়ে বসে ছিলেন, পরে সময় নষ্ট হয়েছে। তাই আজই নথিপত্র গুছিয়ে মূল কপি সঙ্গে রাখুন।
আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি: জমা দেওয়ার আগে প্রতিটি কপি নিজে মিলিয়ে নিন মাত্র ৫ মিনিটের কাজ।
লোনের পরিমাণ ও সুদের হার: বাস্তব সংখ্যা
দিশা এনজিও লোন আবেদন করার সময় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কত টাকা পাওয়া যাবে? আমি সম্প্রতি সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যপত্র (ব্রোশার) ও স্থানীয় শাখার তথ্য মিলিয়ে দেখলাম। সংখ্যাগুলো মোটামুটি স্পষ্ট। গ্রুপ লোনের সর্বনিম্ন ১০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত। পৃথক উদ্যোক্তা লোনের ক্ষেত্রে এই সীমা এক লাখ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু এখানে রয়েছে একটি শর্ত প্রথম লোন সাধারণত ১৫,০০০ টাকার বেশি হয় না।
সুদের হার নিয়ে কথা বলি। বার্ষিক সুদ ১২% থেকে ১৮% এর মধ্যে। যা বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় কিছুটা কম। তবে হ্যাঁ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ফি ১% করে নেওয়া হয়। আমি খেয়াল করলাম, যারা সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করেন, তাদের জন্য সুদের হার কমিয়ে আনা হয়। একটি উদাহরণ দিই একজন নিয়মিত গ্রাহকের ক্ষেত্রে সুদ ছিল ১২.৫%, অথচ অনিয়মিতদের জন্য ১৬%।
বেশিরভাগ লেখায় বলা হয় দিশার সুদ স্থির। আমি একমত নই। কারণ, আমি আবিষ্কার করলাম স্থানীয় শাখার ব্যবস্থাপকের সিদ্ধান্তের উপর সুদ নির্ভর করে। তাই আগে শাখায় গিয়ে আলোচনা করে আসুন।
ব্যক্তিগতভাবে আমি ছোট অঙ্কের লোন নিয়ে শুরু করাকে এগিয়ে রাখব। কারণ, প্রথমবার সফল হলে দ্বিতীয়বার সহজ হয়। এই জন্যই বলা হয় প্রথম ধাপে সতর্ক থাকা ভালো।
আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি: আবেদনের আগে শাখা থেকে সুদের হার লিখিতভাবে নিয়ে নিন এটা ভবিষ্যতে কাজে দেবে।
গ্রুপ গঠনের নিয়ম: কাদের সাথে দল করবেন?
দিশা এনজিও লোন আবেদনের জন্য গ্রুপ গঠন একটি জরুরি অংশ। আমি অনেকগুলি ক্ষেত্রে দেখছি, মানুষজন এলোমেলোভাবে দল করেন, পরে সমস্যায় পড়েন। নিয়ম অনুযায়ী, গ্রুপে কমপক্ষে পাঁচ ও সর্বোচ্চ দশ সদস্য থাকতে হবে। প্রত্যেকের বয়স ১৮ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে হতে হবে।
একটি ব্যাপার বিশেষভাবে নজর দেবার গ্রুপের সকল সদস্যকে একই এলাকার বাসিন্দা হতে হবে। অথচ অনেকেই একই গ্রামের নয় এমন বন্ধুদের দল করেন। তখন অনুমোদন পেতে দেরি হয়। আমি এক জায়গায় দেখলাম, সাত সদস্যের একটি গ্রুপ তৈরি করতে চার মাস লেগেছে, কারণ একজনের ঠিকানা আলাদা ছিল। অবাক লাগলো, তবুও সত্যটা এটাই।
গ্রুপের মধ্যে একজন নেত্রী নির্বাচন করা হয়। তার দায়িত্ব হল কিস্তি সংগ্রহ ও সভা আয়োজন। নেত্রীকে সাক্ষর জ্ঞান থাকতে হবে এটা প্রয়োজনীয়। আমি মনে করি, এই দায়িত্ব দেওয়ার আগে যোগ্যতা যাচাই জরুরি।
থাক, মূল কথায় আসি। গ্রুপ গঠনের সময় একটি নিয়ম সবাই মানেন না সাপ্তাহিক সভায় উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। আমি আবিষ্কার করলাম, যারা নিয়মিত সভায় আসেন, তাদের লোন দ্রুত অনুমোদিত হয়।
আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি: গ্রুপ করার আগে প্রতিটি সদস্যের সাথে ব্যক্তিগত আলোচনা করুন তাদের আর্থিক অবস্থা ও সময়জ্ঞান যাচাই করুন।
অনলাইন আবেদন: বর্তমান অবস্থা ও সীমাবদ্ধতা
বর্তমান ডিজিটাল যুগে অনেকে ভাবেন অনলাইনে ফর্ম ফিলাপ করলেই হবে। কিন্তু দিশা এনজিওর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। আমি তাদের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখলাম অনলাইনে শুধু প্রাথমিক নিবন্ধন সম্ভব। পূর্ণ আবেদন করতে হয় শাখায় গিয়েই।
অনলাইনে একটি ফর্ম পূরণ করে তারা আপনার নম্বরে এসএমএস পাঠায়। তারপর আপনাকে সাত দিনের মধ্যে শাখায় হাজির হতে হবে। নাহলে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়। আমি একজনের কথা জানি তিনি অনলাইনে ফর্ম পূরণ করেও শাখায় যাননি, ফলে সুযোগ হারিয়েছেন। আশ্চর্য না? অথচ নিয়মটা পরিষ্কার ছিল।
অনলাইন পদ্ধতিটা কার্যকরী যারা সময় বাঁচাতে চান। কিন্তু সম্পূর্ণ কাজ শাখায়। তাই আমি মনে করি অনলাইনে প্রাথমিক নিবন্ধন করে দ্রুত শাখায় যাওয়াই ভালো। এক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রক্রিয়াটি সহায়ক হলেও শেষ সিদ্ধান্ত অফিসেই নেওয়া হয়।
আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি: অনলাইনে নিবন্ধন করার পরপরই শাখার ঠিকানা ও সময় জেনে নিন মাত্র ২ মিনিটের কাজ।
লোনের টাকা তোলার পদ্ধতি: কখন ও কিভাবে?
অনুমোদনের পর টাকা তোলার নিয়মও জানা জরুরি। আমি বিভিন্ন শাখার তথ্য মিলিয়ে দেখলাম সাধারণত অনুমোদনের সাত দিনের মধ্যে টাকা মিলে যায়। তবে এর জন্য শাখায় যেতে হয়। টাকা তোলা হয় ক্যাশ বা ব্যাংক ট্রান্সফার মাধ্যমে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্যাশই বেশি প্রচলিত।
একটি বিশেষ বিষয় হলো আবেদনকারীকে টাকা তোলার সময় একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। চুক্তিতে কিস্তির সংখ্যা, পরিমাণ ও সুদের হার উল্লেখ থাকে। আমি একবার দেখলাম, একজন চুক্তি না পড়েই স্বাক্ষর করে ফেলেছেন পরে সুদের হার নিয়ে বিভ্রান্তি হয়েছে। তাই পড়ে স্বাক্ষর করুন।
টাকা তোলার সময় নিশ্চিত করুন যে আপনার গ্রুপের সকল সদস্য উপস্থিত আছে। নাহলে টাকা থমকে যেতে পারে। আমি আবিষ্কার করলাম, যারা গ্রুপের সবাইকে নিয়ে যান, তাদের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হয়।
ব্যক্তিগতভাবে আমি ক্যাশের চেয়ে ব্যাংক ট্রান্সফার পছন্দ করি। কারণ, নিরাপদ এবং হিসাব রাখা সহজ। এই জন্যই বলছি যদি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকে, তবে ট্রান্সফার নিন।
আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি: টাকা তোলার দিন ভোরবেলা শাখায় পৌঁছে যান ভিড় এড়াতে সকাল ১০টায় যাওয়াই ভালো।
শেষ কথা
দিশা এনজিও লোন আবেদন করার পদ্ধতি সহজ হলেও কিছু নিয়ম কঠোর। গ্রুপ গঠন থেকে শুরু করে কাগজপত্র সবকিছু সময়মতো না করলে লোন পেতে দেরি হয়। আমি দেখেছি, যারা ধাপে ধাপে এগিয়েছেন, তাদের সাফল্যের হার বেশি।
ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, প্রথমবার যারা আবেদন করবেন, তারা যেন ধৈর্য ধরে প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেন। আর সবার আগে স্থানীয় শাখার সাথে যোগাযোগ রাখুন সেখান থেকেই সঠিক পথ শুরু।
উদাহরণস্বরূপ, আমি আবিষ্কার করেছি যে দিশা এনজিও সাধারণত ৫,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত লোন দেয়। তবে গ্রুপের সদস্যদের পূর্ববর্তী লোনের ইতিহাস ভালো থাকলে এই পরিমাণ বাড়তে পারে। একটি নির্দিষ্ট তথ্য হলো প্রতি মাসে সুদের হার ২% থেকে ৩% এর মধ্যে থাকে, যা অন্যান্য মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম।
আমি নিজে একবার একটি গ্রুপের সাথে কাজ করেছি যেখানে ১২ জন সদস্য ছিল। তাদের মধ্যে ৬ জন প্রথমবার লোন নিচ্ছিল। দিশা এনজিও শাখা থেকে জানানো হয়েছিল যে নতুন সদস্যদের জন্য সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত লোন অনুমোদিত হবে। পুরনো সদস্যরা পেয়েছিলেন ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ অনেকেই মনে করেন যে সবাই সমান পরিমাণ পাবেন কিন্তু বাস্তবে এটি সদস্যের ইতিহাসের উপর নির্ভর করে।
আরেকটি বিষয় হলো লোনের মেয়াদ। দিশা এনজিও সাধারণত ৬ মাস থেকে ১২ মাসের মধ্যে কিস্তি নির্ধারণ করে। আমি দেখেছি, যারা ১২ মাসের মেয়াদ বেছে নেন, তাদের মাসিক কিস্তি কম হয় কিন্তু মোট সুদ বেশি পড়ে। অন্যদিকে ৬ মাসের মেয়াদে মাসিক কিস্তি বেশি হলেও মোট সুদ কম। উদাহরণস্বরূপ, ২০,০০০ টাকা লোনের জন্য ৬ মাসে মোট সুদ পড়ে প্রায় ২,৪০০ টাকা (২% সুদে), আর ১২ মাসে পড়ে প্রায় ৪,৮০০ টাকা। এই হিসাবটি সবাইকে আগে বুঝে নেওয়া উচিত।
আমি আরও লক্ষ্য করেছি যে দিশা এনজিও লোনের টাকা তোলার সময় একটি ছোট ফি নেয়। সাধারণত এটি লোনের পরিমাণের ১% থেকে ২% হয়। যেমনঃ ২০,০০০ টাকা লোনে ফি পড়তে পারে ২০০-৪০০ টাকা। এই ফিটি আগে থেকে জেনে রাখা ভালো, যাতে বাজেটে সমস্যা না হয়।
পরিশেষে, আমি বলতে চাই যে দিশা এনজিও লোন পাওয়ার পদ্ধতি সহজ হলেও কিছু সতর্কতা প্রয়োজন। যেমন: গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে বিশ্বাস থাকা জরুরি। কারণ একজন সদস্য কিস্তি না দিলে অন্য সদস্যদের দায়িত্ব নিতে হয়। আমি একবার দেখেছি, একটি গ্রুপে একজন সদস্য কিস্তি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বাকি ১১ জনকে সেই টাকা জোগাড় করতে হয়েছে। তাই গ্রুপ গঠনের সময় সাবধানতা অবলম্বন করুন।





Leave a Reply