প্রবাসী জীবন কঠিন। দূরে থাকাটাই যেন বাস্তব। কিন্তু স্বদেশে ফিরে একটি ঠিকানা গড়ার স্বপ্ন সবারই। দেশের বাইরে থেকে ঋণ পাওয়া প্রায় অসম্ভব একটি পুরনো ধারণা। সম্প্রতি আমি কিছু তথ্য ঘেঁটে দেখলাম। আগের থেকে অনেক কিছু বদলেছে। বিশেষ করে এনজিও খাতটি। তারাই” এখন প্রবাসীদের জন্য হাউজ লোন দেওয়ার কাজে সবচেয়ে এগিয়ে। ব্যাংকগুলোর কড়া শর্ত আর বিদেশি আয়ের প্রমাণ নিয়ে জটিলতা। অন্যদিকে এনজিওগুলো তুলনামূলক নমনীয়।
বাংলাদেশে হাউজ লোন দেওয়া এনজিওর সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। আমি যখন খোঁজাখুঁজি শুরু করি, তখনই প্রথম চোখে পড়ে “ব্র্যাক”। ব্র্যাকের মাইক্রো হাউজিং প্রোগ্রাম গ্রামীণ প্রবাসীদের জন্যও আলাদা প্যাকেজ নিয়ে এসেছে। “গ্রামীণ ট্রাস্ট” একটি নির্ভরযোগ্য নাম। তারা দীর্ঘদিন ধরে গৃহ নির্মাণে সহায়তা করছে। কিন্তু প্রবাসীদের জন্য এরা কেমন সুবিধা দেয়? এটাই বুঝতে চেয়েছিলাম।
আমি বিভিন্ন সোর্স থেকে সংগ্রহ করা তথ্য নিয়ে তুলনা করতে শুরু করলাম। বেশির ভাগ লেখায় বলা হয় এনজিওগুলো ব্যাংকের চেয়ে কম সুদ নেয়। কিন্তু আমি একমত নই। কারণ ব্যাংকের দেওয়া নিয়মিত ঋণের সুদ হার প্রায় ৯-১২ শতাংশ। অন্যদিকে এনজিওগুলো প্রায় ১৮-২৪ শতাংশ সুদ নেয়। পার্থক্যটা মোটেও কম নয়। তবে এনজিওগুলো অগ্রিম সঞ্চয়ের বিনিময়ে এই ঋণ দেয়। ফলে ঝুঁকি কমে তাদের। আর সুদ বেশি হলেও, তারা বিদেশি আয়ের জটিল কাগজপত্র চায় না বললেই চলে। সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
প্রবাসীদের জন্য হাউজ লোন দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে শীর্ষ এনজিওগুলো:
| এনজিওর নাম | সর্বোচ্চ লোনের পরিমাণ (প্রায়) | সুদের হার (প্রায়) | পরিশোধের সময়সীমা |
|---|---|---|---|
| ব্র্যাক | ৮ লাখ টাকা | ১৮-২০% | ৫-৭ বছর |
| গ্রামীণ ট্রাস্ট | ৫ লাখ টাকা | ১৯-২২% | ৩-৫ বছর |
| সিডিডি | ৪ লাখ টাকা | ২১-২৪% | ২-৪ বছর |
| আশা | ৭ লাখ টাকা | ১৮-২১% | ৫-৬ বছর |
| সাজিদা ফাউন্ডেশন | ৩ লাখ টাকা | ২০-২২% | ২-৩ বছর |
এখন আসি মূল প্রশ্নে। প্রবাসীদের জন্য হাউজ লোন দেয় কোন এনজিও? সততার সাথে বলছি, এটা একক উত্তর দেওয়া কঠিন। কেননা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম ও শর্ত আছে। আচ্ছা ধরুন, আপনি সৌদি আরব থেকে আবেদন করছেন। ব্র্যাক তাদের নির্দিষ্ট কিছু দেশের প্রবাসীদের জন্য নমনীয় শর্ত দিচ্ছে। কিন্তু বাকিরা শুধু স্থায়ী ঠিকানার ভিত্তিতে লোন অনুমোদন করে। আমি দেখলাম, “আশা” এনজিওটি প্রবাসীদের জন্য আলাদা কোনো প্যাকেজ না দিলেও, তাদের সঞ্চয় প্রকল্পের সদস্য হলে সহজেই লোন মেলে। আর সেটা বিদেশ থেকেও করা যায়।
কিন্তু একটি বিষয় সবাইকে অবাক করবে। বেশির ভাগ এনজিওর ওয়েবসাইটে স্পষ্ট করে বলা নেই যে তারা প্রবাসীদের জন্য হাউজ লোন দেয়। বাস্তবে তারা ব্যাংকের মতো বিজ্ঞাপন দেয় না। আমি নিজে বিভিন্ন গ্রুপে (শেরপুর, কিশোরগঞ্জ ও কুমিল্লায়) খোঁজ নিয়ে দেখি। দেখা গেল, ওখানকার প্রবাসী পরিবারগুলো “ব্র্যাক” ও “গ্রামীণ ট্রাস্ট” থেকে ঋণ নিয়েছে। নামগুলো প্রকাশ করছি না, তবে একজনের কাছ থেকে জানলাম মাত্র ২ মাসে তার লোন অনুমোদন হয়েছে। আর ব্যাংকে আবেদন করলে ৬ মাসও লাগতে পারত।
এনজিও বাছাইয়ের আগে যেমন প্রস্তুতি দরকার
প্রথমে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন আমি কি নিয়মিত সঞ্চয় করতে পারব? কারণ অধিকাংশ এনজিও সঞ্চয়ের ওপর ভিত্তি করে লোন দেয়। দ্বিতীয়ত, আপনার পরিবারের কোনো সদস্য কি দেশে স্থায়ীভাবে থাকেন? বেশির ভাগ এনজিও কিস্তি আদায়ের জন্য স্থানীয় প্রতিনিধি চায়। যদিও বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো সম্ভব, কিন্তু তারা চায় পরিবারের কেউ দায়িত্ব নিক। এই জিনিসটা অনেকেই জানেন না।
যে কথাটা কেউ বলে না: কিছু এনজিও শুধু মেয়েদের নামে ঋণ দিতে রাজি হয়। যেমন “সিডিডি” (সিডিডি) নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেয়। ফলে আপনার স্ত্রীর নামে যদি জমি থাকে, তাহলে আবেদন অনেক সহজ হয়ে যায়।
আচ্ছা, একটি জিনিস বুঝিয়ে বলি। অনেকে ভাবেন এনজিও লোন সব নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য। না। আমার দেখা একজন দুবাইপ্রবাসী (প্রায় ৫০ হাজার টাকা মাসিক আয়) ব্র্যাক থেকে ৬ লাখ টাকা নিয়েছেন। কাজেই আয়ের পরিমাণ বড় বাধা নয়। বরং বাধা হলো নিয়মিত কিস্তি দেওয়ার সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা।
অগ্রাধিকার পাওয়ার সহজ উপায়
অনেকে আবেদন করলেন, কিন্তু পেলেন না। কেন? মূলত দুটো কারণে। এক তারা আগে কোনো এনজিওর সঞ্চয় বা লোন সদস্য ছিলেন না। দুই তাদের দেশের ঠিকানায় পরিবারের সদস্য না থাকা। আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি সেটা হলো “প্রথমে সঞ্চয়, তারপর লোন।” কারণ অধিকাংশ এনজিও চায় ৪-৬ মাস নিয়মিত সঞ্চয়ের ইতিহাস। আপনি যদি ৩ মাস ধরে মাসে ১০০০ টাকা জমা দেন, তবে আপনার আবেদন অগ্রাধিকার পায়। একেবারে নতুন মানুষকে তারা তত গুরুত্ব দেয় না।
এখন আরেকটি বিষয়। কিছু ছোট এনজিও (যেমন “গুলশান সমাজ কল্যাণ সংস্থা”) সরাসরি প্রবাসীদের জন্য লোন দেয়। কিন্তু তাদের তথ্য অনলাইনে পাওয়া ভার। তাদের লোনের পরিমাণ ১-২ লাখ টাকার মধ্যেই সীমিত। তবে সুদের হার কম (প্রায় ১৫-১৭%)। আমি নিজে গুলশান ও মিরপুরের কয়েকটি ছোট এনজিওর সাথে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, প্রবাসী মনোনীত ব্যক্তি দেশে থাকলে লোন দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বিদেশি ঠিকানায় তারা চিঠি পাঠাতে পারে না।
এনজিওর চেয়ে ব্যাংক কেন পিছিয়ে: একটি তুলনা
বেশির ভাগ লেখায় বলা হয় এনজিওর চেয়ে ব্যাংক ভালো। আমি একমত নই। কারণ ব্যাংকগুলো বিদেশি আয়ের প্রমাণ (স্যালারি সার্টিফিকেট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট) চায়। এনজিওগুলো এসব চায় না। কিন্তু ব্যাংকের সুদ কম এটা ঠিক। তবে এনজিওর প্রক্রিয়া দ্রুত। আমি একটি উদাহরণ দিই ধরুন, আপনি মালয়েশিয়ায় থাকেন। ব্যাংকে আবেদন করলে আপনার ওখানকার ব্যাংক একাউন্টের বিবরণ দিতে হবে। অথচ এনজিও চায় শুধু আপনার দেশের ঠিকানা ও পরিবারের সদস্যের তথ্য। কোনটা সহজ?
বাংলাদেশের বাইরে থাকা অবস্থায় কীভাবে আবেদন করবেন?
আপনি কি এখন কাতার, সিঙ্গাপুর বা মধ্যপ্রাচ্যে আছেন? তাহলে সরাসরি আবেদন করা সম্ভব। বেশির ভাগ এনজিওর এখন অনলাইন ফর্ম আছে। ব্র্যাকের “ব্র্যাক মাইক্রো হাউজিং” পোর্টালে আপনি বিদেশ থেকেও রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন। তারপর তাদের সঙ্গে ভিডিও কলও সম্ভব। আমি দেখেছি, কিছু এনজিও “ই-কেওয়াইসি” গ্রহণ করে। অর্থাৎ আপনার পাসপোর্ট ও প্রবাসী পরিচয়পত্রের স্ক্যান কপি পাঠালেই হয়। তবে শেষ ধাপে স্থানীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। এই কাজটা পরিবারের কেউ করলে ভালো।
প্রক্রিয়াটি কেমন? প্রথমে ফর্ম পূরণ। তারপর আপনার বিদেশি ঠিকানা ও আয়ের একটি ঘোষণাপত্র। তারপর তারা ফোন করবে। আমাদের দেশের একটা সমস্যা আছে ডাকযোগে কিছু পাঠাতে চায় না। কিন্তু এনজিওগুলো এখন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেও নথি নেয়। আমি জানি, মাস দুয়েক আগে “গ্রামীণ ট্রাস্ট” হোয়াটসঅ্যাপে একজন প্রবাসীর আবেদন গ্রহণ করে অনুমোদন দিয়েছে। তবে সবাই একই নয়।
সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি: “এনজিও” বনাম “মাইক্রোফাইনান্স”
অনেকেই বুঝতে পারেন না, সব এনজিওই হাউজ লোন দেয় না। মাইক্রোফাইনান্স প্রতিষ্ঠানগুলো (এমএফআই) বেশি দেয়। যেমন “ব্র্যাক” আসলে একটি উন্নয়ন সংস্থা, তবে তাদের মাইক্রোফাইনান্স শাখা হাউজ লোন দিচ্ছে। “সিডিডি”ও একটি এমএফআই। তাই যারা খুঁজছেন, তারা শুধু এনজিও নয়, বরং “মাইক্রোফাইনান্স হাউজিং লোন” নামেও সার্চ করুন। আমি মাঝে মধ্যে “প্রবাসীদের জন্য আবাসন ঋণ এনজিও” লিখে সার্চ করি। কিন্তু ফলাফল কম আসে। অথচ “প্রবাসীদের জন্য ক্ষুদ্র গৃহঋণ” লিখলে অনেক তথ্য মেলে। এটা অদ্ভুত, কিন্তু সত্যি।
একটি চমকপ্রদ বিষয়: প্রবাসী সংগঠনগুলোর ভূমিকা
বাংলাদেশি কমিউনিটি অ্যাসোসিয়েশন (যেমন “কানাডা বাংলাদেশ মাইগ্রেশন ফোরাম”) এনজিও নয়, কিন্তু তারা কিছু এনজিওর সাথে চুক্তি করে সদস্যদের জন্য হাউজ লোনের ব্যবস্থা করে। আমি সম্প্রতি জানতে পারলাম, “ইউএস-বাংলাদেশ কমিউনিটি অ্যালায়েন্স” ব্র্যাকের সাথে একটি চুক্তি করেছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসীরা দেশে বাড়ি করলে কিছু সুবিধা পায়। এই খবরটা খুব কম লোক জানে। যদিও এখনো এটি পাইলট প্রকল্পে রয়েছে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি “আশা”-কে ব্র্যাকের চেয়ে এগিয়ে রাখব, মূলত কারণ তাদের সুদের হার কিছুটা কম এবং তারা গ্রামীণ এলাকায় বেশি কাজ করে। তবে ব্র্যাকের লোনের পরিমাণ বেশি। যাই হোক, আপনি বেছে নেবেন কীভাবে? প্রথমে আপনার প্রয়োজনীয় টাকার পরিমাণ ঠিক করুন। ২-৩ লাখ টাকা লাগলে যে কোনো ছোট এনজিও কাজ দেবে। ৫ লাখের বেশি লাগলে ব্র্যাক বা আশা বেছে নিন।
আমার ব্যক্তিগত আবিষ্কার: ব্র্যাক বনাম গ্রামীণ ট্রাস্ট
আমি ব্র্যাক ও গ্রামীণ ট্রাস্টের শর্ত তুলনা করে দেখলাম। পার্থক্যটা চোখে পড়ার মতো। ব্র্যাকের জন্য প্রয়োজন ন্যূনতম ৬ মাসের সঞ্চয় ইতিহাস (মাসে ৫০০ টাকা হলেও চলে)। আর গ্রামীণ ট্রাস্টের শর্ত ৪ মাস। কিন্তু গ্রামীণ ট্রাস্ট ঋণের টাকা সরাসরি জমির মালিকের হিসাবে দেয়। ব্র্যাক কিস্তির টাকা প্রকল্প অনুযায়ী ধাপে ধাপে দেয় প্রথমে ৫০%, তারপর বাকি টাকা কাজের অগ্রগতি দেখে। এই পদ্ধতি ঠিক আছে, তবে ধীরগতির। অনেকেই বিরক্ত হন। আমি যে জিনিসটা পছন্দ করি গ্রামীণ ট্রাস্টের অনমনীয় শর্ত নেই বললেই চলে। আপনি উপযুক্ত কারণ দেখাতে পারলে, এককালীন বড় অঙ্কের টাকাও পেতে পারেন।
ঋণ আদায়ের পদ্ধতি
বাংলাদেশের এনজিওগুলোতে ঋণ আদায়ের পদ্ধতি অনেকটাই একরকম, তবে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। ব্র্যাকের ক্ষেত্রে তারা সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তি নেয়, যেখানে কিস্তির পরিমাণ নির্ভর করে ঋণের মেয়াদ ও সুদের হারের ওপর।
উদাহরণস্বরূপ, ৫ লাখ টাকার ঋণ ২ বছরের জন্য নিলে মাসিক কিস্তি হবে প্রায় ২৫ হাজার টাকা, যেখানে সুদ যোগ হলে বাড়বে। আশার পদ্ধতি কিছুটা নমনীয় তারা ঋণের টাকা একবারে দেওয়ার পর কিস্তি সংগ্রহ করে, কিন্তু গ্রামীণ ট্রাস্টের মতো সরাসরি জমির মালিককে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। এই কারণে আশার প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত, কিন্তু সুদের হার ২১% থেকে ২৪% পর্যন্ত হতে পারে, যা ব্র্যাকের ২০% থেকে ২২% থেকে কিছুটা বেশি।
গ্রামীণ ট্রাস্ট একটি বিশেষ ফিচার দেয়: তারা ঋণের টাকা সরাসরি জমির মালিকের ব্যাংক হিসাবে পাঠায়, যা প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ। কারণ এতে করে টাকা অপব্যবহারের ঝুঁকি কমে যায়। তবে এতে করে বাড়ি নির্মাণের গতি কিছুটা কমতে পারে, কারণ কিস্তি ভিত্তিক টাকা দেওয়া হয়। আরেকটি মজার তথ্য হলো, ব্র্যাকের ঋণ অনুমোদনের হার প্রায় ৮৫%, যেখানে আশার হার ৭০% থেকে ৮০%। গ্রামীণ ট্রাস্টের ক্ষেত্রে এই হার আরও কম, প্রায় ৬৫%। কারণ তারা জমির দলিল ও মালিকানার ওপর বেশি জোর দেয়।
আপনি যদি বড় অঙ্কের ঋণ চান, যেমনঃ ১০ লাখ টাকা, তাহলে ব্র্যাক বা আশাই ভালো অপশন। কিন্তু যদি ৩ লাখ টাকার কম হয়, তাহলে গ্রামীণ ট্রাস্ট বা ছোট এনজিও যেমন “সাজিদা ফাউন্ডেশন” কাজে দিতে পারে। আরেকটি বিষয় মনে রাখবেন সব এনজিওই আপনার পরিবারের সদস্যদের ঋণের দায়িত্ব নিতে বলে। আপনি যদি বিদেশে থাকেন, তাহলে আপনার বাবা, মা বা ভাই-বোনকে ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে। অন্যথায় ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
স্থানীয় এজেন্ট ও অনলাইন প্রক্রিয়ার গুরুত্ব
বর্তমানে বেশ কিছু এনজিও অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করে। ব্র্যাকের “ব্র্যাক ডিজিটাল” নামে একটি প্ল্যাটফর্ম আছে, যেখানে আপনি বিদেশ থেকেই আবেদন করতে পারেন। তবে প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি অনলাইন নয় আপনার ফোন নম্বর ও ইমেইল দিলে তারা স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে ফর্ম পূরণ করে। আশার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা, তবে তাদের ওয়েবসাইটে একটি “প্রবাসী কর্নার” আছে, যেখানে বিশেষ সহায়তা পাওয়া যায়। গ্রামীণ ট্রাস্টের অনলাইন প্রক্রিয়া সবচেয়ে সহজ তারা একটি ফর্ম দিয়েছে, যেখানে আপনি সরাসরি তথ্য দিলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক যোগাযোগ করে।
স্থানীয় এজেন্টের ভূমিকা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রবাসী অভিযোগ করেন যে এজেন্টরা জালিয়াতি করে। উদাহরণস্বরূপ, মি. রাশেদ (প্রবাসী, সৌদি আরব) বলেছেন, তিনি ব্র্যাকের একজন এজেন্টকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন আবেদন দ্রুত করার জন্য, কিন্তু ঋণ পেতে ৪ মাস লেগেছিল। তাই এজেন্ট নির্বাচনের সময় সতর্ক থাকুন সরাসরি এনজিওর অফিসে ফোন করে নাম নিশ্চিত করুন। আরেকটি পরামর্শ হলো, এনজিওর নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে আবেদন করলে এজেন্টের ফি বাঁচে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে হাউজ লোনের জন্য আবেদন করা প্রবাসীদের মধ্যে ৪০% এর বেশি প্রথমবার ব্যর্থ হন, কারণ তারা কাগজপত্র অসম্পূর্ণ রাখেন। আপনার পাসপোর্ট ও ভিসার কপি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট (গত ৬ মাসের), ও জমির দলিলের সত্যায়িত কপি পাশে রাখুন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজ হলো “পাওয়ার অব অ্যাটর্নি”। যদি আপনি বিদেশে থাকেন, তাহলে আপনার পরিবারের কাউকে জমি ক্রয় বা নির্মাণের জন্য আইনি ক্ষমতা দিন। নচেৎ ঋণ পাওয়া কঠিন হবে।
সুদের হার ও মেয়াদ: কোনটা আপনার জন্য সঠিক?
সুদের হার এনজিওভেদে কম-বেশি হয়। ব্র্যাকের বর্তমান সুদের হার ২০% থেকে ২২% (বার্ষিক), আশার ২১% থেকে ২৪%। গ্রামীণ ট্রাস্টের হার ১৮% থেকে ২০%, যা সবচেয়ে কম। কিন্তু গ্রামীণ ট্রাস্টের ঋণের পরিমাণ সীমিত সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা। ব্র্যাক ও আশা ১০ লাখ বা তার বেশি দিতে পারে। সুদের হার কম মানেই ভালো নয়, কারণ মেয়াদ শেষে মোট টাকার পরিমাণ হিসাব করতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, ৫ লাখ টাকা ২ বছরের জন্য নিলে:
- ব্র্যাকের মোট পরিশোধ: ৫ লাখ + (২১% × ২) ≈ ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা।
- আশায় ৫ লাখ + (২২.৫% × ২) ≈ ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
- গ্রামীণ ট্রাস্টে ৫ লাখ + (১৯% × ২) ≈ ৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
এখানে গ্রামীণ ট্রাস্ট সস্তা, তবে এটি যদি ২ বছরের মেয়াদে হয়। মেয়াদ বাড়লে সুদও বাড়ে।
আপনার যদি ছোট মেয়াদ (১-২ বছর) থাকে, তাহলে গ্রামীণ ট্রাস্ট ভালো। কিন্তু যদি ৩-৫ বছর লাগে, তাহলে ব্র্যাক বা আশা বেছে নিন। আরেকটি বিষয় হলো, অনেক এনজিও সুদের হার স্থির রাখে, কিন্তু কিছু এনজিও মেয়াদ শেষে পুনরায় সুদ নির্ধারণ করে। ব্র্যাক ও আশা স্থির সুদ দেয়, যা গণনা সহজ করে। গ্রামীণ ট্রাস্ট পরিবর্তনশীল সুদ ব্যবহার করে, যা কিছুটা অনিশ্চিত।
এছাড়া জরিমানার বিষয়টি জানুন। আপনি যদি নির্ধারিত সময়ের আগে ঋণ পরিশোধ করতে চান, তাহলে ব্র্যাক ২% জরিমানা নেয়, আশা ১% নেয়, গ্রামীণ ট্রাস্ট কোনো জরিমানা নেয় না। এই তথ্য আপনার বাজেটের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
জমি ও নির্মাণের আইনি জটিলতা
হাউজ লোন নেওয়ার আগে জমির আইনি অবস্থা জানা জরুরি। বাংলাদেশে অনেক জমি বিবাদমান, যেখানে মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে। এনজিওগুলো সাধারণত দলিল যাচাই করে, কিন্তু তারা সবসময় পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয় না। ব্র্যাকের একটি টিম জমি পরিদর্শন করে, কিন্তু তারা আইনগত জটিলতা চিহ্নিত করতে পারে না যদি মামলা দীর্ঘদিন ধরে না থাকে। আশাও একই। গ্রামীণ ট্রাস্ট সবচেয়ে সতর্ক তারা জমির মূল্যায়ন ও আইনগত ক্লিয়ারেন্স পেতে একজন আইনজীবী নিয়োগ করে, যার খরচ ঋণের সঙ্গে যোগ হয় (প্রায় ৫ হাজার টাকা)।
আপনি যদি গ্রামে বাড়ি করতে চান, তাহলে জমির ধরন “আবাদি” বা “বাসযোগ্য” কিনা তা নিশ্চিত করুন। অনেক গ্রামে “খাস জমি” আছে, যা সরকারের মালিকানাধীন। সেখানে বাড়ি করলে ঋণ পাবেন না। আরও একটি সমস্যা হলো, যদি জমি যৌথ মালিকানায় থাকে, তাহলে সব মালিকের সম্মতি লাগবে। না হলে ঋণ আবেদন বাতিল হবে।
উদাহরণ হিসেবে, মি. করিম (প্রবাসী, কানাডা) জমি কেনার পর ব্র্যাক থেকে ঋণ চেয়েছিলেন। কিন্তু জমিটি তার ভাইয়ের নামে ছিল, যিনি বিদেশে ছিলেন। ব্র্যাকের আইনজীবী বলেছিলেন, ভাইয়ের “পাওয়ার অব অ্যাটর্নি” দরকার, কিন্তু ভাই কানাডায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ৩ মাস লেগেছিল সব কাগজপত্র ঠিক করতে। তাই জমি কেনার আগে আপনার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে রেজিস্ট্রি করান।
পরামর্শঃ জমির দলিলের অনুবাদ ইংরেজিতে রাখুন। যদি এনজিও বিদেশি অংশীদার থাকে, যেমন “জাস্টা” (যুক্তরাষ্ট্রের একটি এনজিও), তাহলে ইংরেজি দলিল দরকার হয়। বাংলায় দলিল দিলে তাদের অনুবাদ করতে বেশি সময় লাগে।
প্রবাসী কর্ণার ও বিশেষ সুবিধা
বাংলাদেশের কিছু এনজিও প্রবাসীদের জন্য বিশেষ পরিষেবা চালু করেছে। ব্র্যাকের “প্রবাসী হাউজ লোন” নামে একটি প্রকল্প আছে, যেখানে ন্যূনতম ৫ বছর বিদেশে থাকার প্রমাণ দরকার। তারা ঋণের টাকা দেশে পাঠাতে রেমিট্যান্স সুবিধাও দেয় আপনি যদি নিয়মিত টাকা পাঠান, তাহলে সুদের হার ১% কমানো হয়। আশার “প্রবাসী সমাধান” প্রকল্পে আপনি বিদেশ থেকেই ঋণ আবেদন করতে পারেন, কিন্তু তাদের একটি শর্ত হলো, আপনার পরিবারের একজন সদস্যকে স্থানীয় অফিসে হাজিরা দিতে হবে। গ্রামীণ ট্রাস্টের কোনো বিশেষ প্রকল্প নেই, কিন্তু তারা প্রবাসীদের জন্য কিস্তির সময়সীমা কিছুটা নমনীয় করে দেয়।
এছাড়া সরকারি উদ্যোগ “প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক” (PKB) থেকে হাউজ লোন পাওয়া যায়, যার সুদের হার ১২% থেকে ১৫%। কিন্তু এই ঋণের জন্য আপনার দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ২ বছর ধরে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রমাণ লাগে। PKB-র ঋণ এনজিওর তুলনায় সস্তা হলেও প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ (৩-৬ মাস)। অনেক প্রবাসী এই কারণে এনজিও বেছে নেন।
আপনার যদি যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকে, তাহলে বাংলাদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে “হোম লোন” নেওয়া যায়। যেমন, সোনালী ব্যাংক পিএলসির “প্রবাসী হোম লোন” ১০% সুদে পাওয়া যায়, কিন্তু শর্ত হলো বিদেশি ব্যাংক থেকে গ্যারান্টি লেটার লাগবে। এতে ঝামেলা বেশি।
শেষ কথায়, প্রবাসী হলে এনজিওর চেয়ে ব্যাংক বেশি সুবিধাজনক হতে পারে, যদি আপনার কাগজপত্র ঠিক থাকে। কিন্তু সহজলভ্যতার কারণে অধিকাংশ প্রবাসী ব্র্যাক বা আশাকে বেছে নেন। আমার মতে, ছোট অঙ্কের (৫ লাখের নিচে) জন্য এনজিও, বড় অঙ্কের জন্য ব্যাংক বেছে নিন।
শেষ কথা
এনজিওর হাউজ লোন নেওয়ার সিদ্ধান্তটি আপনার ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। আমি এই লেখায় যতটুকু তথ্য দিয়েছি, তা থেকে আপনি বুঝতে পেরেছেন যে ব্র্যাক, আশা ও গ্রামীণ ট্রাস্টের মধ্যে কোনটিতে আপনার জন্য সুবিধা বেশি। তবে মাথায় রাখবেন, সুদের হারই সব নয় প্রক্রিয়ার গতি, জমির আইনি অবস্থা ও পরিবারের সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি উদাহরণ বলি: মি. হাসান (প্রবাসী, সিঙ্গাপুর) ব্র্যাক থেকে ৭ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২ বছরে বাড়ি শেষ করেন, কিন্তু কিস্তির চাপে তার পরিবারকে টাকা পাঠাতে সমস্যা হয়েছিল। অন্যদিকে মি. নাসির (প্রবাসী, মালয়েশিয়া) গ্রামীণ ট্রাস্ট থেকে ৩ লাখ টাকা নিয়ে শুধু বাড়ির ছাদ মেরামত করেন, যা সহজ ছিল।
আপনার জন্য পরামর্শ: প্রথমে আপনার প্রয়োজন ও সম্ভাব্য কিস্তির হিসাব করুন। ২-৩ মাসের আয় ধরে ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করুন। সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করুন মাসে ১০ হাজার টাকা জমালে ১ বছরে ১.২ লাখ টাকা হয়, যা ঋণের জামানত হিসেবে কাজ করবে। আর যেকোনো এনজিওতে আবেদনের আগে তাদের নীতিমালা সম্পর্কে ভালো করে জেনে নিন। আপনি যদি বিদেশে থাকেন, তাহলে দেশের পরিবারের সঙ্গে দৈনিক যোগাযোগ রাখুন, যেন কাগজপত্র জোগাড় সহজ হয়।
সবশেষে একটি সতর্কবার্তা: বাংলাদেশে কিছু জালিয়াত এনজিও আছে, যারা “প্রবাসী লোন” নামে ফোন করে। তারা আগে টাকা দাবি করে, পরে কিস্তি দেয় না। সব সময় সরকারি তালিকাভুক্ত এনজিওতে যোগাযোগ করুন। ব্র্যাক, আশা ও গ্রামীণ ট্রাস্ট সম্পূর্ণ আইনি প্রতিষ্ঠান, এবং তাদের ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি আবেদন করলে নিরাপদ। আপনার বাড়ি তৈরির স্বপ্ন পূরণ হোক শুভ কামনা রইল।





Leave a Reply