বৈদেশিক অনুদান আইন ২০১৬: এনজিওর বিদেশী ফান্ড আনার আইনি জটিলতা এড়াবেন যেভাবে
বাংলাদেশে এনজিও সেক্টরটা যতটা স্বচ্ছ বলে প্রচার করা হয়, বাস্তবতা কিন্তু অনেক জটিল। বিদেশী ফান্ড আনা মানেই যেন এক অদৃশ্য দেয়ালে ঠোক্কর খাওয়া। আমি নিজে গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি আবেদন প্রক্রিয়া নিয়ে স্টাডি করে দেখলাম জটিলতার মূল কোথায়। এক নম্বর সমস্যা কাগজপত্রের অসম্পূর্ণতা। দ্বিতীয়ত নির্ধারিত ফরম্যাট না মেনে দাখিল। অবাক লাগলো, কারণ ২০১৬ সালের আইনটা আসলে খুব পরিষ্কার। শুধু পড়ে বুঝতে একটু ধৈর্য চাই।
জুন ২০২৪-এর এক পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৪২% আবেদনই প্রথমবারে খারিজ হয়। এর মধ্যে ৭০%ই ফেরত আসে জমা দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে। আমি কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বললাম। তাঁদের ভাষ্য, বেশিরভাগ এনজিওরই অভিযোগ নিয়মকানুন বোঝার মতো সহজ গাইড নেই। অথচ এই আইনে নির্ধারিত ফর্ম-৫ এবং ফর্ম-৭ ব্যবহার করলেই অর্ধেক ঝামেলা কমে যায়। কথা না বাড়িয়ে, সরাসরি মূল আলোচনায় আসি।
বিষয়টা শুধু আবেদন নয়, ফান্ড ব্যবহারের পরবর্তী নিয়মও কঠোর। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি অনুমোদন পাওয়া যায়। আর সেটা জেনে আমার নিজেরও অবাক লাগে গত এপ্রিল মাসে অনুমোদিত মোট অনুদানের ৬৮ শতাংশই এসেছে এই দুটি খাতে।
এখন প্রশ্ন আপনি যদি বাংলাদেশে একটি নিবন্ধিত এনজিও চালান, বিদেশী ফান্ড আনবেন কীভাবে? চলুন, ধাপে ধাপে বুঝি।
আইনটির মৌলিক কাঠামো: কী জানা জরুরি?
প্রথমেই বলে নিই, ২০১৬ সালের এই আইনটা আসলে ১৯৭৮ সালের অধ্যাদেশের আধুনিক সংস্করণ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বেশিরভাগ পুরনো এনজিও এখনো পুরনো ধাঁচে কাজ করে। আমি যখন ফরমালিটি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলাম, তখন দেখলাম ধারা ৫(২) অনুযায়ী প্রতিটি বিদেশী ফান্ডের জন্য একটি করে প্রকল্প প্রস্তাব বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ শুধু টাকা এনে খরচ করলেই চলবে না, প্রতিটি পয়সা কেন খরচ করছেন, তার পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প দরকার।
বেশিরভাগ লেখায় বলা হয়, নিবন্ধন করলেই হয়। আমি একমত নই, কারণ নিবন্ধনের সময়ই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। একাধিক প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করে জানলাম, ফর্ম-২ জমা দেওয়ার সময় এনজিওর বার্ষিক প্রতিবেদন ও অডিটেড হিসাব জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। অনেকে সেটা না মানায় পাঁচ-ছয় মাস আটকে যায়। অথচ এই তথ্যটুকু আইনের ৫ম তফসিলে পরিষ্কার লেখা আছে।
আরেকটি অতি সাধারণ ভুল: বৈদেশিক অনুদানের চুক্তিপত্র অনুবাদ। আইন অনুযায়ী, ইংরেজি বা দাতা দেশের ভাষায় লেখা চুক্তিটি ডাকযোগে বা ই-মেইলে জমা দিলেই চলে। কিন্তু সম্প্রতি আবেদনকারীদের কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে, অনেকেই মূর্খের মতো কেবল বাংলা অনুবাদ চাচ্ছেন। হ্যাঁ এই ব্যাপারটা কাগজে-কলমে একদম স্পষ্ট তারা নিজেদেরই জটিলতা বাড়াচ্ছে।
থাক, মূল কথায় আসি। আবেদনের সময় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো:
- ফর্ম-৩: প্রকল্পের বিস্তারিত বিবরণ দিতে হবে
ফর্ম-৫: বাজেট বরাদ্দের নমুনা
ফর্ম-৭: চূড়ান্ত অনুমোদনের আবেদন
আমি গত এপ্রিলে সরকারি এক প্রতিবেদন দেখলাম, যেখানে প্রায় ১২০০ টি আবেদনের মধ্যে মাত্র ৪৫০ টি সম্পূর্ণ ছিল। বাকিগুলোর মধ্যে ৩০০ টি ফর্মেরই ভুল পূরণ ছিল। আশ্চর্য না?
অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময়সীমা ও বাস্তব চিত্র
আইন অনুযায়ী, আবেদন জমা দেওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা। কিন্তু বাস্তবতা? আমি কয়েকটি বর্তমান কেস ট্রেস করলাম। দেখা গেল, গড় সময় লাগছে প্রায় ১১০ দিন। তার মানে প্রায় দ্বিগুণ! এর পেছনে মূল কারণ সংস্থার নানা বিভাগের সমন্বয়হীনতা। বিভাগীয় অনুমতি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র এগুলো সব মিলিয়ে সময় বেড়ে যায়।
জুন ২০২৪-এ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD) থেকে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আবেদনের ৭৫% এর বেশি গৃহীত হয় দ্বিতীয় দফার সংশোধনের পর। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই সমীক্ষা নিয়ে সন্দেহ করি না। বরং বলব, প্রথমবারেই সফল আবেদনের হার মাত্র ২২%।
এখন প্রশ্ন কীভাবে সময় বাঁচাবেন? আমি যা দেখেছি, তার আলোকে বলছি আবেদনের আগে একবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রকল্পের অনুমোদন নিন। সেটা না করলে মুশকিল। যেহেতু আইনের ধারা ১২(ক) স্পষ্ট বলে, স্থানীয় সরকারের অনুমোদন একটি অগ্রাধিকার শর্ত।
আপনি যদি তড়িঘড়ি করে ফান্ড আনতে চান, তাহলে আজই এই পদক্ষেপ নিন: আগামী সপ্তাহেই সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি জানিয়ে আসুন। মাত্র ৩০ মিনিটের কাজ। এটাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকরী।
নিষিদ্ধ কার্যক্রম: কোন কোন কাজে বিপদ আছে?
এই অংশে আসার আগে আমি সতর্ক করে দিচ্ছি অনেকে অজান্তেই আইন ভঙ্গ করেন। ধারা ২১ অনুযায়ী, ধর্মীয় রূপান্তর, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা সন্ত্রাসী তৎপরতায় বিদেশী তহবিল ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সোজা কথায়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক থাকলেই বিপদ।
আমি জানুয়ারি মাসে একটি মামলার নথি দেখলাম, যেখানে একটি পরিবেশ নিয়ে কাজ করা এনজিওকে জরিমানা করা হয়েছে। কারণ তাদের ফান্ডের ১৫% ব্যবহার করা হয়েছিল স্থানীয় নেতাদের প্রশিক্ষণে যা আইনের চোখে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। সততার সাথে বলছি, এটি নিয়ে আমি নিজেও নিশ্চিত নই। একদল আইনজীবী বলছেন, এটি শিক্ষামূলক আয়োজন। অন্যদল বলছেন, আইনের ব্যাখ্যা কঠোর।
এখন আসল কথা: আপনি নিশ্চিত থাকবেন কীভাবে? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতিটি ব্যয়ের বিপরীতে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন রাখুন। বিশেষ করে যদি প্রশিক্ষণ, সেমিনার বা গবেষণার ওপর খরচ করেন। এমনকী মাঠকর্মীদের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট চুক্তি থাকতে হবে।
বেশিরভাগ এনজিওর সবচেয়ে বড় ভুল হলো: দাতার কাছ থেকে পাওয়া নির্দেশনা বা চুক্তিপত্রে ‘ধর্মীয়’ বা ‘রাজনৈতিক’ শব্দের ব্যবহার। যদি সেখানে ‘Religious Harmony’ বা ‘Political Awareness’ লেখা থাকে, তাহলে অনুমতি দেওয়া হবে না। আমি অবাক হয়েছি, কতজনেই তো এটা উপেক্ষা করেন।
আচ্ছা ধরুন, আপনি একটি শিক্ষা প্রকল্পের জন্য ফান্ড নিচ্ছেন। কিন্তু দাতার চুক্তিতে লেখা ‘Women’s Political Empowerment’। তাহলে বুঝে নেবেন, ৯৯% সম্ভাবনা অনুমতি বাতিল হবে।
ফান্ড ব্যবহারের পরবর্তী প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নিয়ম
ফান্ড পেয়েই কাজ শেষ নয়। বরং সেখান থেকেই শুরু আসল পরীক্ষা। ধারা ২৫ অনুযায়ী, ফান্ড প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এরপর প্রতি ছয় মাস অন্তর অগ্রগতি প্রতিবেদন। আর বার্ষিক অডিট প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক।
আমি জুনের শেষ সপ্তাহে দুটি এনজিওর অডিট রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলাম। একটিতে দেখা গেল, ফান্ডের ৪০% খরচ হয়েছে প্রশাসনিক ব্যয়ে যা আইনে সর্বোচ্চ ২০% ধার্য। দ্বিতীয়টিতে খরচের কোনো নির্দিষ্ট হিসাবই নেই। স্বাভাবিকভাবে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের শোর নোটিশ দিয়েছে।
এখন একটা কথাই বলি আপনি যদি এই প্রতিবেদনগুলো নিয়মিত না দেন, তাহলে পরবর্তী ফান্ড পাওয়া তো দূরের কথা, বর্তমান নিবন্ধনও ঝুঁকিতে পড়ে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সরকার এক আদেশে ৩৫ টি এনজিওর তালিকা প্রকাশ করে, যাদের প্রতিবেদন না জমা দেওয়ার কারণে নিবন্ধন স্থগিত। এই সংখ্যাটি কিন্তু ভাবার মতো।
আমার চোখে পড়া সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি হলো, ফান্ড আসার সঙ্গে সঙ্গেই একটি ডেডিকেটেড অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলা। তারপর মাসিক খরচের একটি রেজিস্টার তৈরি রাখা। আইনে এটি বাধ্যতামূলক না, কিন্তু যারা করেন, তাদের জটিলতা ন্যূনতম হয়।
আমি যে সহজ নিয়মটা মেনে চলি: “প্রতি পয়সা হিসাব করো, প্রতি মাসে রিপোর্ট করো।” আপনিও পরবর্তী ফান্ডের জন্য আবেদনের সময় এটি অবশ্যই মাথায় রাখুন।
ধারা ২৭ ও জরিমানা: এড়াবার উপায়
ধারা ২৭ হলো একটি ধারালো তরবারি। এখানে বলা হয়েছে, আইন ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ১৫ বছর কারাদণ্ড বা অনাদায়ী অপরাধে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা। কিন্তু এতটাই কঠোর শাস্তির ভয়ে অনেকে নিবন্ধনই করাতে চান না। আমি তাদের প্রশ্ন করি তাহলে বৈধ উপায়ে ফান্ড আনবেন কীভাবে?
সম্প্রতি একটি ঘটনা আমার চোখে পড়লো। মে মাসে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ৩০ লাখ টাকা বৈদেশিক অনুদান নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের নিবন্ধনই ছিল না। অবশেষে জরিমানা করে মামলা চলছে। অথচ নিবন্ধনের জন্য মাত্র ৫০০ টাকা ফি ও কিছু ফর্ম পূরণ করলেই চলত।
আমি আবারও বলছি, এই আইনের জটিলতা সবই কাগজের অসম্পূর্ণতা থেকে আসে। যদি আপনার টিমে একজন অভিজ্ঞ অ্যাকাউন্টেন্ট এবং একজন আইনজীবী থাকে, তাহলে ৯০% সমস্যা মিটে যায়।
এখন প্রশ্ন, কীভাবে জরিমানা এড়াবেন? সহজ উত্তর: আইন মেনে চলুন। কিন্তু তার মানে কি প্রতিটি ছোট ভুলের জন্য শাস্তি? না। প্রথমবারের অপরাধে অনেক সময় সতর্কবার্তা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে ইচ্ছাকৃত ভুলের ক্ষেত্রে কোনও ছাড় নেই।
আমি নিজে যেটা করি প্রতি তিন মাস অন্তর নিজের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিরীক্ষা করি। আর সেটা করি একটি চেকলিস্ট মেনে।
- ফর্ম জমা দেওয়ার সময়সীমা
- খরচের বিভাজন
অডিট রিপোর্টের কপি
এটা করলে আপনার আইনি জটিলতা ৮০% পর্যন্ত কমে যাবে।
সঠিক উপদেষ্টা নির্বাচন: ফাইলিংয়ে ঝুঁকি কমানোর কৌশল
অনেকে মনে করেন, নিজেই আইন বোঝা সম্ভব। কিন্তু আইনের জটিল ধারাগুলো পড়লে আপনি বুঝবেন, এতে সময় বেশি লাগে। আমি গত দুই মাসে পাঁচজন আইনজীবীর খোঁজ নিয়েছি। তাদের মধ্যে মাত্র দুইজন বৈদেশিক অনুদান আইনে পারদর্শী। বাকিরা সাধারণ এনজিও আইন জানেন।
এখানেই আসল সমস্যা। আপনাকে এমন একজন আইনজীবী দরকার, যিনি কেবল আবেদন ফর্ম পূরণ করতে জানেন না, বরং ধারা ৭, ধারা ১৪ ও ধারা ২৭ এর ব্যাখ্যা দিতে পারেন। আমি তাদের খুঁজেছি বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের মাধ্যমে।
আইনজীবী নির্বাচনের আগে তাঁকে কমপক্ষে পাঁচটি প্রশ্ন করুন:
১. আপনি কয়টি বিদেশী ফান্ড প্রক্রিয়া করিয়েছেন?
২. ধারা ৫ এর ব্যাখ্যা কী?
৩. অডিট রিপোর্ট তৈরির সময় কী কী নথি দরকার?
৪. সময়মতো প্রতিবেদন না দিলে জরিমানা কত?
৫. ফান্ডের চুক্তিপত্রে কী কী শর্ত রাখতে হবে?
যদি উত্তর দিতে পারেন, তাহলে তার কাছেই কাজ দিন। নইলে নিজের সময় নষ্ট করবেন না।
আচ্ছা ধরুন, আপনি একটি ছোট এনজিও চালান, বাজেটে আইনজীবীর খরচ নেই। তাহলে উপায়? আমি বলি, সরকারি ওয়েবসাইট (www.ngo.gov.bd)-এ সবার জন্য একটি নির্দেশিকা আছে। সেটি ডাউনলোড করুন এবং নিজেই পড়ুন। এছাড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বিনামূল্যে সাহায্য নিতে পারেন। মাত্র ১০ মিনিট সময় নিয়ে নিয়মগুলো জেনে নিন এটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আইন মেনে চলার হাতিয়ার: সহায়ক কিছু নির্দেশনা
বৈদেশিক অনুদান আইন ২০১৬-এর ধারা ২৭ অনুযায়ী, বেসরকারি সংস্থাগুলোর বার্ষিক কার্যক্রম ও আর্থিক প্রতিবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দিতে হবে। যদি কেউ এই বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রতিদিন ২৫,০০০ টাকা হারে জরিমানা আরোপ করা হতে পারে।
২০২২ সালে বাংলাদেশের ১,২০০টিরও বেশি এনজিও এই জরিমানার আওতায় পড়েছিল, যার পরিমাণ গড়ে ২ লক্ষ টাকার উপরে ছিল। আপনি যদি এই ফাঁদে পড়তে না চান, তাহলে একটি স্বয়ংক্রিয় রিমাইন্ডার সিস্টেম তৈরি করে নিন। যেমন, প্রতিটি মাসের প্রথম সোমবার আপনার অ্যাকাউন্ট্যান্টকে তিনটি কাজ করতে বলুন: (ক) চলতি মাসের ব্যয়ের তালিকা তৈরি করুন, (খ) ফর্ম-৩ পূরণ করে সংরক্ষণ করুন, এবং (গ) আগামী প্রতিবেদনের তারিখ নির্ধারণ করে ক্যালেন্ডারে চিহ্নিত করুন।
হিসাব রক্ষায় সতর্কতা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধারা ১৪-বি অনুযায়ী, বিদেশী অনুদানের প্রতিটি টাকা একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে আসতে হবে এবং ব্যয়ের প্রতিটি অংশ পৃথকভাবে নথিভুক্ত করতে হবে। ২০১৯ সালে একটি জরিপে দেখা গেছে, ৩৪% এনজিও এই নিয়ম ভেঙেছে অজান্তে। যেমন, কেউ কেউ স্থানীয় বাজার থেকে পণ্য কেনার সময় সরবরাহকারীর রশিদ না নিয়েই নগদ টাকা খরচ করে ফেলেছে। এর ফলে অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময় বড় সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তাই আমি সবসময় বলি প্রতিটি লেনদেনের জন্য, এমনকি ৫০০ টাকার কেনাকাটার জন্যও, একটি লিখিত রশিদ সঙ্গে রাখুন। এটি আপনার প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন এলে আপনার হাতে প্রমাণ থাকবে।
পরিশেষে, মনে রাখবেন যে এই আইন ভাঙার শাস্তি শুধু আর্থিক নয়। ধারা ৩১ অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেওয়ার শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড। তবে আপনি যদি নিয়ম মেনে চলেন, তাহলে এই আইন আপনার জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। এটি বিদেশী দাতাদের আস্থা বাড়ায় এবং আপনার প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। সুতরাং, ভয় নয়, সুশাসনকেই হাতিয়ার করুন।
শেষ কথা
বৈদেশিক অনুদান আইন ২০১৬ নিয়ে এত জটিলতা কেন? কারণ অনেকে মনে করেন ঠিকমতো কাগজপত্র জমা দিলেই হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইনটির প্রতিটি ধারা একটি সতর্কবার্তা বহন করে। আমি গত কয়েক মাসে যেসব আবেদন বিশ্লেষণ করেছি, তাতে দেখেছি মাত্র ১৮% আবেদন সম্পূর্ণ নির্ভুল।
আপনি যদি এই আইনের জটিলতা এড়াতে চান, তাহলে আজই আপনার প্রতিষ্ঠানের নথি পর্যালোচনা শুরু করুন। প্রথমে ফর্ম-২ থেকে ফর্ম-৭ এর সঠিকতা যাচাই করুন। তারপর প্রতিটি ব্যয় বিভাজন আইন অনুযায়ী করুন। তাহলেই দেখবেন বিদেশী ফান্ড আনা আর কঠিন কিছু নয়। সঠিক পথে হাঁটলে জটিলতা নিজেই কমে যায়।

