নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এনজিও সহায়তা
বাংলাদেশে অনেক নারী ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করছেন। কেউ ঘরে তৈরি খাবার, পোশাক, হস্তশিল্প বা কৃষিপণ্য নিয়ে কাজ করছেন, আবার কেউ অনলাইনভিত্তিক দোকান, সেবা বা ক্ষুদ্র উৎপাদন ব্যবসা গড়ে তুলছেন। কিন্তু একটি ভালো ব্যবসার ধারণা থাকলেই সব সময় এগিয়ে যাওয়া সহজ হয় না। প্রাথমিক মূলধন, ব্যবসা পরিচালনার জ্ঞান, বাজার খোঁজা, হিসাব রাখা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতের মতো বিষয়গুলো নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের সেবা কেবল অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠান ও কর্মসূচিভেদে ক্ষুদ্রঋণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, আর্থিক সাক্ষরতা, সঞ্চয়, কারিগরি দক্ষতা এবং বাজারসংযোগের সুযোগ থাকতে পারে। বিশেষ করে গ্রাম, উপজেলা ও শহরতলির অনেক এলাকায় শাখাভিত্তিক সেবা পাওয়া যায়।
তবে ব্যবসার জন্য একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: প্রথমে ঋণ, পরে ব্যবসা এই পদ্ধতির পরিবর্তে প্রথমে বাজার, বিক্রি ও ব্যবসার হিসাব যাচাই করে তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন বিবেচনা করা বেশি বাস্তবসম্মত। কোন প্রতিষ্ঠান কী সহায়তা দেয়, আবেদন করার আগে কী প্রস্তুতি দরকার এবং ঋণের মোট খরচ ও কিস্তির শর্ত কীভাবে তুলনা করবেন, তা জানা থাকলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
- গুরুত্বপূর্ণ: এই লেখাটি সাধারণ তথ্য ও প্রস্তুতিমূলক নির্দেশনার জন্য। কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনুমোদন, নির্দিষ্ট ঋণের পরিমাণ, সেবা মাশুল, কিস্তি বা অন্যান্য শর্ত এখানে নিশ্চিত করা হচ্ছে না। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ লিখিত শর্ত, মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এমআরএ সনদ যাচাই করুন।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এনজিও সহায়তা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশের ব্যবসার শুরু হয় ব্যক্তিগত সঞ্চয় অথবা পরিবারের সীমিত অর্থ দিয়ে। ফলে পণ্য উৎপাদন বাড়ানো, নতুন যন্ত্রপাতি কেনা, কাঁচামাল সংগ্রহ কিংবা দোকান সম্প্রসারণের সময় অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন দেখা দেয়। প্রচলিত ব্যাংক ঋণের জন্য প্রয়োজনীয় নথি বা আর্থিক ইতিহাস অনেক নতুন উদ্যোক্তার না থাকায় এনজিওভিত্তিক ক্ষুদ্র অর্থায়ন তাদের জন্য একটি বিকল্প পথ হতে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিত সঞ্চয় ও ঋণ পরিশোধের অভ্যাস ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তুতিও তৈরি করতে পারে।
এনজিও থেকে কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যেতে পারে?
সব এনজিও একই ধরনের সেবা দেয় না। প্রতিষ্ঠান এবং প্রকল্প অনুযায়ী সুবিধা পরিবর্তিত হয়। সাধারণভাবে একজন নারী উদ্যোক্তা ক্ষুদ্র ব্যবসার অর্থায়ন, সঞ্চয় সুবিধা, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ, আর্থিক হিসাব রাখার ধারণা, কৃষি বা উৎপাদনভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং বাজারসংযোগের মতো সহায়তা পেতে পারেন। কিছু প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব ব্যবসা, ডিজিটাল ব্যবসা অথবা নির্দিষ্ট পণ্যখাতের উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা সহায়তাও থাকে।
ব্র্যাকের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের সুযোগ
ব্র্যাক বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সংস্থা এবং এর ক্ষুদ্র অর্থায়ন কার্যক্রমের মধ্যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য প্রগতি কর্মসূচি রয়েছে। ব্র্যাকের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রগতি ওই বছরে প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার উদ্যোক্তাকে সহায়তা করেছে এবং ৩১ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। প্রতিবেদনে নারী পরিচালিত ব্যবসার ওপর ৪৫ শতাংশ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যবসার সক্ষমতা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও ব্র্যাক কাজ করে।
কোনো নারী উদ্যোক্তা ব্র্যাকের সহায়তা নিতে চাইলে প্রথমে নিকটবর্তী শাখায় নিজের ব্যবসার ধরন, কতদিন ধরে ব্যবসা করছেন এবং অর্থটি কী কাজে ব্যবহার করবেন তা পরিষ্কারভাবে জানানো ভালো। ঋণের পরিমাণের চেয়ে ব্যবসা থেকে মাসে কত টাকা উদ্বৃত্ত থাকে এবং সেই অর্থ থেকে কিস্তি দেওয়া সম্ভব কি না এই হিসাব আগে করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শক্তি ফাউন্ডেশনের নারী-কেন্দ্রিক অর্থায়ন
শক্তি ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের নারীদের আর্থিক ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির জন্য কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের ক্ষুদ্র অর্থায়ন কর্মসূচির ঋণগ্রহীতাদের প্রায় ৯৮ শতাংশ নারী। প্রতিষ্ঠানটি জাগরণসহ বিভিন্ন ঋণসেবা পরিচালনা করে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগের জন্য অগ্রসর ধরনের অর্থায়নও রয়েছে। জাগরণ কর্মসূচিতে ব্যবসার জন্য ঋণ ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু হওয়ার তথ্য প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে।
তবে প্রকাশিত একটি অঙ্ক দেখেই ঋণের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। নিজের এলাকায় বর্তমানে কোন কর্মসূচি চালু আছে, সদস্য হওয়ার নিয়ম, মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ, কিস্তির সময়সূচি এবং অন্য কোনো খরচ রয়েছে কি না এসব শাখা থেকে লিখিতভাবে জেনে নেওয়া দরকার।
আশার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন
আশা বাংলাদেশে বিস্তৃত ক্ষুদ্র অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও অর্থায়ন কার্যক্রম রয়েছে। দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির শাখা থাকায় অনেক এলাকার নারী উদ্যোক্তা নিজ এলাকার শাখায় ব্যবসার ধরন, প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ এবং বর্তমান ঋণসেবার শর্ত সম্পর্কে জানতে পারেন।
ব্যবসা চালু থাকার প্রমাণ, আয়-ব্যয়ের ধরন এবং ঋণ ব্যবহারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার রাখা আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়ক হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট ঋণের বর্তমান সীমা ও শর্ত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আবেদনের সময় সংশ্লিষ্ট শাখার হালনাগাদ তথ্যই অনুসরণ করা উচিত।
টিএমএসএস থেকে অর্থায়ন ও দক্ষতা উন্নয়ন
টিএমএসএস মূলত নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ক্ষুদ্র অর্থায়ন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মসূচিতে জাগরণ, অগ্রসর, বুনিয়াদ, সুফলন এবং নতুন উদ্যোগের মূলধনসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। শুধু অর্থায়ন নয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আয়বর্ধক কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে দেখার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠানটি অনুসরণ করে। কৃষি, ক্ষুদ্র উৎপাদন অথবা নিজস্ব উদ্যোগ নিয়ে কাজ করা নারীরা এলাকার কর্মসূচি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সহায়তার সুযোগ খুঁজতে পারেন।
পিকেএসএফের অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুযোগ
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন বা পিকেএসএফ সাধারণত বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আর্থিক ও উন্নয়ন সহায়তা পৌঁছে দেয়। পিকেএসএফের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সংগঠিত সদস্যের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ১৯ লাখ, যাদের ৯৩ শতাংশের বেশি নারী। তাই নিজের এলাকায় কোন অংশীদার প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি পরিচালনা করছে তা যাচাই করে যোগাযোগ করা ভালো।
পিকেএসএফের চলমান ক্ষুদ্র উদ্যোগ অর্থায়ন ও ঋণ সহায়তা প্রকল্পে অন্তত এক লাখ নতুন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের লক্ষ্য রয়েছে, যাদের অন্তত ৮০ শতাংশ নারী হওয়ার কথা। একই প্রকল্পে অন্তত ৬০ হাজার নারী ঋণগ্রহীতাকে উদ্যোক্তা দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে। তাই নিজের এলাকায় কোন পিকেএসএফ অংশীদার প্রতিষ্ঠান বর্তমানে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালনা করছে তা খোঁজ নেওয়া কার্যকর হতে পারে।
এনজিওর পাশাপাশি সরকারি সহায়তার সুযোগও দেখুন
নারী উদ্যোক্তার জন্য শুধু এনজিওতে সীমাবদ্ধ থাকা প্রয়োজন নেই। এসএমই ফাউন্ডেশনের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পরিচালিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রশিক্ষণ, মেলা, উদ্যোক্তা পুরস্কার, ক্রেতা-বিক্রেতা সংযোগ এবং ঋণ সংযোগের মতো সুবিধার জন্য আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের পরামর্শকেন্দ্র থেকে ব্যবসা পরিকল্পনা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি, বাজার এবং ট্রেড লাইসেন্সসহ ব্যবসার নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪–২৫ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট সিএমএসএমই ঋণের স্থিতির অন্তত ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য রাখার নির্দেশনা রয়েছে। প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখায় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক সহায়তা ডেস্ক রাখার নির্দেশও রয়েছে। নির্দিষ্ট পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত নিশ্চয়তার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত ছাড়া ঋণ বিবেচনার সুযোগের কথাও নীতিমালায় বলা হয়েছে। ফলে ব্যবসা কিছুটা প্রতিষ্ঠিত হলে এনজিওর পাশাপাশি ব্যাংকের নারী উদ্যোক্তা ডেস্কেও যোগাযোগ করা যেতে পারে।
সহায়তার জন্য আবেদন করার আগে যা প্রস্তুত করবেন
আবেদন করার আগে একটি ছোট ব্যবসা নথি তৈরি করুন। এতে ব্যবসার নাম, পণ্য বা সেবা, কতদিন ধরে ব্যবসা করছেন, মাসিক বিক্রি, মাসিক খরচ, বর্তমান লাভ, কত টাকা দরকার এবং টাকা কোথায় ব্যবহার করবেন তা লিখুন। জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, মোবাইল নম্বর, ঠিকানার তথ্য, ব্যবসার লেনদেনের রেকর্ড এবং প্রযোজ্য হলে ট্রেড লাইসেন্স প্রস্তুত রাখুন। ব্যবসার জন্য আলাদা ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক হিসাব ব্যবহার করলে লেনদেন বোঝানো আরও সহজ হয়।
ঋণ নেওয়ার আগে নগদ প্রবাহের হিসাব করুন
নারী উদ্যোক্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কত টাকা পাওয়া যাবে তা নয়, ব্যবসার নগদ প্রবাহ অনুযায়ী কত টাকা পরিশোধ করা সম্ভব তা নির্ধারণ করা। ধরুন সব ব্যবসায়িক খরচ বাদ দেওয়ার পর মাসে ১৫ হাজার টাকা থাকে। সেই পুরো অর্থ কিস্তিতে দেওয়ার পরিকল্পনা করা ঠিক হবে না, কারণ বিক্রি কমে যাওয়া, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি বা জরুরি খরচ দেখা দিতে পারে। তাই কিস্তির হিসাব করার সময় ব্যবসার স্বাভাবিক ওঠানামা সামাল দেওয়ার জন্য কিছু অর্থ হাতে রাখার পরিকল্পনা করা উচিত।
এমআরএ সনদ যাচাই করে তারপর ক্ষুদ্রঋণ নিন
কোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ নেওয়ার আগে সেটি মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি বা এমআরএ-এর সনদপ্রাপ্ত কি না যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। এমআরএ অনলাইনে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সনদ যাচাইয়ের ব্যবস্থা রেখেছে। অচেনা ব্যক্তি বা অননুমোদিত মাধ্যমের কাছে টাকা জমা না দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক শাখা, লিখিত নথি, রসিদ এবং সনদের তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
নারী উদ্যোক্তার জন্য একটি বাস্তবসম্মত করণীয় পরিকল্পনা
প্রথম সপ্তাহে ব্যবসার গত তিন মাসের বিক্রি ও খরচ লিখে ফেলুন। দ্বিতীয় ধাপে কী পরিমাণ অতিরিক্ত মূলধন সত্যিই দরকার তা নির্ধারণ করুন। এরপর নিজের এলাকার অন্তত দুই বা তিনটি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের শর্ত ও প্রশিক্ষণের সুযোগ জেনে তুলনা করুন। সম্ভব হলে অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যবসা ব্যবস্থাপনা বা বাজারজাতকরণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করুন। সবশেষে ঋণের অর্থ কেবল পূর্বনির্ধারিত ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করুন এবং ব্যক্তিগত খরচ ও ব্যবসার অর্থ আলাদা রাখুন। এই ছোট অভ্যাসগুলো অনেক সময় বড় অঙ্কের ঋণের চেয়েও ব্যবসাকে বেশি স্থিতিশীল করে।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এনজিও সহায়তা সম্পর্কে ১০টি প্রশ্ন ও উত্তর
১. নতুন ব্যবসা শুরু করতে কি এনজিও থেকে সহায়তা পাওয়া যায়?
কিছু প্রতিষ্ঠান নতুন বা ছোট পরিসরের উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন বা নতুন উদ্যোগের মূলধন কর্মসূচি পরিচালনা করে। তবে যোগ্যতা প্রতিষ্ঠান ও কর্মসূচিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসা আগে থেকেই চালু থাকা, নিয়মিত আয় থাকা বা নির্দিষ্ট সময় সদস্য থাকার শর্ত থাকতে পারে। তাই ব্যবসার ধারণা, সম্ভাব্য ক্রেতা এবং প্রাথমিক বাজেট প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট শাখায় বর্তমান শর্ত জেনে আবেদন করা ভালো।
২. নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কি আলাদা ঋণ রয়েছে?
কিছু এনজিও ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নারীকেন্দ্রিক কর্মসূচি পরিচালনা করে, আবার কিছু সাধারণ ক্ষুদ্র উদ্যোগ ঋণেও নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালাতেও নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়ানোর জন্য পৃথক লক্ষ্য ও সহায়তা ডেস্ক রয়েছে। তবে ঋণের ধরন, সীমা ও যোগ্যতা প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা।
৩. ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া কি এনজিও ঋণ পাওয়া সম্ভব?
কিছু ছোট ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে ট্রেড লাইসেন্স সব সময় বাধ্যতামূলক নাও হতে পারে। কিন্তু বড় ব্যবসায়িক ঋণ বা আনুষ্ঠানিক ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচালনা করতে ট্রেড লাইসেন্স এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য নিবন্ধন সম্পন্ন করা উপকারী।
৪. এনজিও ঋণের জন্য জামানত লাগে কি?
অনেক ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় প্রচলিত ব্যাংক ঋণের মতো সম্পত্তির জামানত প্রয়োজন হয় না। তবে সদস্যপদ, ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই, ব্যবসা পরিদর্শন, পূর্বের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস অথবা অন্য ধরনের নিশ্চয়তার ব্যবস্থা থাকতে পারে। কোন নথিতে স্বাক্ষর করছেন এবং আপনার দায় কতটুকু তা বুঝে নেওয়া জরুরি।
৫. এনজিও থেকে শুধু ঋণ ছাড়া অন্য সহায়তা পাওয়া যায় কি?
হ্যাঁ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সাক্ষরতা, কৃষি ও উৎপাদন দক্ষতা, হিসাবরক্ষণ এবং বাজারসংযোগের মতো সহায়তা দিয়ে থাকে। প্রকল্পভেদে সুযোগ পরিবর্তিত হয়। নতুন উদ্যোক্তার জন্য অর্থ গ্রহণের আগে বা পাশাপাশি প্রশিক্ষণ নেওয়া ব্যবসার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
৬. কোন এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া সবচেয়ে ভালো?
সবার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে সেরা বলা যুক্তিযুক্ত নয়। আপনার এলাকার শাখা, ব্যবসার ধরন, প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ, কিস্তির সময়সূচি, মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা বিবেচনা করতে হবে। অন্তত দুই বা তিনটি প্রতিষ্ঠানের লিখিত শর্ত তুলনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।
৭. অনলাইন ব্যবসার নারী উদ্যোক্তারাও কি সহায়তা পেতে পারেন?
অনলাইনভিত্তিক পণ্য বা সেবা ব্যবসার উদ্যোক্তারাও কিছু কর্মসূচিতে সহায়তার জন্য বিবেচিত হতে পারেন। কোন ধরনের ব্যবসা গ্রহণযোগ্য তা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির শর্তের ওপর নির্ভর করে। নিয়মিত বিক্রির তথ্য, পণ্য সংগ্রহের রেকর্ড এবং ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস সংরক্ষণ করলে ব্যবসার কার্যক্রম দেখানো সহজ হয়।
৮. ঋণের টাকা কোন কাজে ব্যবহার করা ভালো?
কাঁচামাল কেনা, বিক্রিযোগ্য মজুত বাড়ানো, উৎপাদন সরঞ্জাম কেনা অথবা এমন কাজে অর্থ ব্যবহার করা ভালো যেখান থেকে অতিরিক্ত বিক্রি বা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যক্তিগত ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় সাজসজ্জা বা ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কহীন কাজে ঋণের অর্থ ব্যবহার করলে কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে।
৯. ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান বৈধ কি না কীভাবে যাচাই করব?
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির সনদ যাচাই ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের সনদ বৈধ কি না যাচাই করা যায়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক শাখা ও লিখিত নথি ব্যবহার করুন এবং টাকা জমা দিলে রসিদ সংগ্রহ করুন। সন্দেহ হলে এমআরএ-এর প্রকাশিত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্য যাচাই করুন।
১০. ব্যবসা বড় হলে কি এনজিও থেকে ব্যাংক ঋণে যাওয়া উচিত?
ব্যবসার বিক্রি, লাভ ও লেনদেনের ধারাবাহিক ইতিহাস তৈরি হলে ব্যাংকের নারী উদ্যোক্তা সহায়তা ডেস্কের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। ব্যাংকভিত্তিক সিএমএসএমই অর্থায়নে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক নীতিগত লক্ষ্য ও সহায়তা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ব্যাংক বা এনজিও যেখান থেকেই অর্থ নেওয়া হোক, ঋণের পরিমাণ ও কিস্তি ব্যবসার বাস্তব নগদ প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এনজিও সহায়তা ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণে একটি সম্ভাব্য সহায়ক পথ হতে পারে, বিশেষ করে যখন অর্থায়নের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, সঞ্চয়, দক্ষতা উন্নয়ন ও বাজারসংযোগের সুযোগ থাকে। ব্র্যাক, আশা, টিএমএসএস, শক্তি ফাউন্ডেশন এবং পিকেএসএফের অংশীদার প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি এসএমই ফাউন্ডেশন ও ব্যাংকের নারী উদ্যোক্তা সহায়তা ব্যবস্থাও দেখা যেতে পারে। তবে আবেদন করার আগে ব্যবসার হিসাব যাচাই, প্রতিষ্ঠানের সনদ বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় নিশ্চিত করা, মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ বোঝা এবং লিখিত শর্ত পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকি কমানোর বাস্তবসম্মত উপায়।

