নারীদের জামানতবিহীন ঋণ দেয় যেসব এনজিও
নিজের ছোট ব্যবসা শুরু করা, চলমান ব্যবসার পুঁজি বাড়ানো, কৃষি বা গবাদিপশু পালন, সেলাই, হস্তশিল্প কিংবা পরিবারের আয়বর্ধক কোনো কাজে অর্থের প্রয়োজন হলে অনেক নারী প্রথমেই ব্যাংক ঋণের কথা ভাবেন। কিন্তু নিয়মিত আয়, সম্পত্তির দলিল, জামানত বা ব্যাংকিং ইতিহাস না থাকায় প্রচলিত ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে যায়। এই জায়গায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী এনজিওগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি বা এমআরএর ২০২৩–২৪ অর্থবছরের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ৭২৪টি সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ২৬ হাজারের বেশি শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি ১৬ লাখ এবং ঋণগ্রহীতা প্রায় ৩ কোটি ২২ লাখ। সদস্যদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। এই পরিসংখ্যান থেকে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণের চিত্র পাওয়া যায়।
তবে এখানে একটি বিষয় শুরুতেই বোঝা জরুরি। জামানতবিহীন ঋণ মানে শর্তবিহীন ঋণ নয়। সম্পত্তির দলিল বা স্বর্ণ বন্ধক না লাগলেও সদস্যপদ, নিয়মিত সঞ্চয়, আয়বর্ধক কাজের পরিকল্পনা, বাড়ি বা ব্যবসা যাচাই, পূর্বের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস এবং কিস্তি দেওয়ার সক্ষমতার মতো বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে। তাই শুধু কত টাকা ঋণ পাওয়া যাবে তা না দেখে মোট কত টাকা ফেরত দিতে হবে এবং কিস্তি নিজের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য যাচাই নোট: এই লেখায় উল্লেখ করা ঋণসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্য ও এমআরএর তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঋণের পরিমাণ, জামানত, সঞ্চয়, কিস্তি, সার্ভিস চার্জ ও যোগ্যতার নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান লিখিত শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
নারীদের ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে কোন এনজিওগুলো বিবেচনায় রাখতে পারেন
বাংলাদেশে অসংখ্য সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থাকলেও সব প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে বর্তমান ঋণের জামানত নীতি একইভাবে প্রকাশ করা নেই। নিচের প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে তাদের প্রকাশ্য ঋণ তথ্য, নারী-কেন্দ্রিক কার্যক্রম এবং ক্ষুদ্রঋণ খাতে উপস্থিতির ভিত্তিতে। আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে সর্বশেষ লিখিত শর্ত নেওয়া উচিত।
১. ব্র্যাক
ব্র্যাকের প্রকাশিত ক্ষুদ্রঋণ তথ্য অনুযায়ী, নারীদের জন্য নারী দলের মাধ্যমে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্র্যাকের ২০২৫ সালের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তাদের ঋণের ৮৯ শতাংশ নিয়েছেন নারী। ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি এবং বিভিন্ন আয়বর্ধক কাজের জন্যও প্রতিষ্ঠানটির আলাদা ঋণ কর্মসূচি রয়েছে।
ব্র্যাকের বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি থাকায় ঋণের পরিমাণ ও শর্ত সবার জন্য একই নাও হতে পারে। আবেদনকারীর প্রয়োজন, আয়বর্ধক কাজ, পরিশোধের সামর্থ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির নিয়ম অনুযায়ী ঋণের পরিমাণ নির্ধারিত হতে পারে।
২. শক্তি ফাউন্ডেশন
শক্তি ফাউন্ডেশন নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাগরণ ঋণ মূলত এমন নারী ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য, যারা প্রচলিত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজে ঋণ সুবিধা পান না। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এই জামানতবিহীন ঋণের পরিমাণ ৩০ হাজার টাকা থেকে ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আবেদন করার আগে বর্তমান পরিমাণ ও পরিশোধের শর্ত শাখা থেকে যাচাই করা উচিত।
যারা ঘরে বসে উৎপাদন, ছোট দোকান, সেলাই, খাবার তৈরি, পশুপালন বা অন্য কোনো আয়বর্ধক উদ্যোগ শুরু করতে চান, তারা স্থানীয় শক্তি ফাউন্ডেশন শাখায় এই কর্মসূচির বর্তমান যোগ্যতা ও কিস্তির ধরন জানতে পারেন।
৩. বুরো বাংলাদেশ
বুরো বাংলাদেশ তাদের প্রকাশিত তথ্যে জামানত ও প্রসেসিং ফি ছাড়া ঋণ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নারীদের অর্থায়নকেও তাদের কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে। বুরোর বর্তমান ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম দেশের ৬৪ জেলায় রয়েছে এবং সক্রিয় ঋণগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ৪১ হাজারের বেশি।
বুরোর বিভিন্ন ধরনের সাধারণ, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, দুর্যোগ, পানি ও স্যানিটেশন এবং অন্যান্য ঋণ কর্মসূচি রয়েছে। কোন কর্মসূচি একজন নারীর জন্য উপযুক্ত হবে তা তার কাজ ও অর্থের প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করবে।
৪. পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র
পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র তাদের প্রকাশিত ঋণ তথ্য অনুযায়ী গ্রাম ও শহরের স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনা করে। এসব ঋণ আয়বর্ধক কাজ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, কৃষি, ছোট ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগে ব্যবহার করা যায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সদস্য হিসেবে নিবন্ধনের পর প্রথম ঋণের আগে সাত দিনের অপেক্ষার সময় থাকতে পারে।
এটি কেবল নারীদের জন্য পরিচালিত প্রতিষ্ঠান নয়, তবে নারী সদস্যরাও যোগ্যতা অনুযায়ী জামানতবিহীন অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারেন। তাই নিকটস্থ শাখায় নারীদের জন্য বর্তমানে কোন ঋণ সুবিধা রয়েছে তা আলাদাভাবে জেনে নেওয়া ভালো।
৫. আশা
আশা বাংলাদেশের বিস্তৃত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী দেশে তাদের ৩ হাজারের বেশি শাখা এবং প্রায় ৭০ লাখ গ্রাহক রয়েছে। আশার পুরোনো প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে জামানত ও দলগত গ্যারান্টি ছাড়া ঋণ দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। তবে পুরোনো নথির এই শর্তকে বর্তমান সব ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।
আশা থেকে ঋণের আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে বর্তমান ঋণের পরিমাণ, জামানত বা জামিনদারের প্রয়োজন আছে কি না, সঞ্চয়ের নিয়ম, কিস্তির সময়সূচি, সার্ভিস চার্জ এবং মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ লিখিতভাবে জেনে নেওয়া উচিত।
৬. উদ্দীপন
উদ্দীপনের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের আওতায় জাগরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী জাগরণ কর্মসূচি মূলত স্বল্প আয়ের সদস্যদের, বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক কাজে সহায়তার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে উদ্দীপনের বর্তমান প্রকাশ্য পৃষ্ঠায় প্রতিটি নারী ঋণকে সরাসরি জামানতবিহীন বলে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে আবেদন করার আগে স্থানীয় শাখায় জামানত, জামিনদার, সঞ্চয় এবং সদস্যপদের বর্তমান নিয়ম নিশ্চিত করা জরুরি।
৭. টিএমএসএস
টিএমএসএস বিভিন্ন উন্নয়ন ও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত ক্ষুদ্রঋণ তথ্য অনুযায়ী জাগরণ, অগ্রসর, বুনিয়াদ, সাহস ও সুফলনসহ বিভিন্ন ধরনের ঋণ পণ্য রয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে স্বল্প আয়ের পরিবার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং আয়বর্ধক কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া হয়।
টিএমএসএসের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নারীদের অগ্রাধিকার থাকলেও বর্তমান ঋণ পণ্যের জামানতসংক্রান্ত নিয়ম কর্মসূচিভেদে আলাদা হতে পারে। তাই ঋণ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে সম্পূর্ণ পরিশোধ সূচি সংগ্রহ করা উচিত।
জামানতবিহীন ঋণ নিতে সাধারণত কী কী প্রয়োজন হতে পারে
এনজিও ও কর্মসূচিভেদে নিয়ম আলাদা হলেও সাধারণভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, বর্তমান ঠিকানা, পরিবারের তথ্য, মোবাইল নম্বর এবং যে কাজে টাকা ব্যবহার করা হবে তার বিবরণ চাওয়া হতে পারে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে আগে সদস্য হতে হয় এবং নির্দিষ্ট সময় সঞ্চয় করার পর ঋণের আবেদন করা যায়। মাঠকর্মী আবেদনকারীর বাড়ি বা ব্যবসার স্থান যাচাইও করতে পারেন।
যিনি আগে থেকেই ছোট ব্যবসা করছেন তিনি দৈনিক বা মাসিক আয়-ব্যয়ের একটি সাধারণ হিসাব প্রস্তুত রাখলে নিজের ঋণ সক্ষমতা বোঝাতে সুবিধা হয়। নতুন ব্যবসার ক্ষেত্রে কত টাকা লাগবে, কোথায় খরচ হবে এবং কিস্তি দেওয়ার টাকা কোথা থেকে আসবে তার একটি বাস্তব হিসাব থাকা প্রয়োজন।
ঋণ নেওয়ার আগে যে পাঁচটি বিষয় অবশ্যই যাচাই করবেন
- প্রতিষ্ঠানটির এমআরএ সনদ কার্যকর আছে কি না যাচাই করুন।
- কত টাকা হাতে পাবেন এবং সব কিস্তি মিলিয়ে মোট কত টাকা ফেরত দেবেন লিখে নিন।
- সাপ্তাহিক নাকি মাসিক কিস্তি এবং প্রথম কিস্তি কবে থেকে শুরু হবে জানুন।
- সঞ্চয়, সদস্য কল্যাণ তহবিল বা অন্য কোনো ফি থাকলে তার লিখিত বিবরণ নিন।
- প্রতিটি জমার রসিদ এবং নিজের পাশবই নিজের কাছে রাখুন।
এমআরএর ওয়েবসাইটে সনদপ্রাপ্ত ও সনদ বাতিল হওয়া ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রতিষ্ঠান যাচাইয়ের জন্য এমআরএর ই-ভেরিফিকেশন ব্যবস্থাও রয়েছে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানে ঋণের আবেদন বা টাকা জমা দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটির সনদ বর্তমানে কার্যকর আছে কি না এমআরএর তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।
সার্ভিস চার্জ বোঝা কেন জরুরি
ঋণের ক্ষেত্রে শুধু প্রতিটি কিস্তির অঙ্ক দেখলে মোট ব্যয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নাও পাওয়া যেতে পারে। এমআরএর গ্রাহক সচেতনতামূলক তথ্যে ক্ষুদ্রঋণের সার্ভিস চার্জ, কিস্তি, সঞ্চয় ও অন্যান্য খরচ সম্পর্কে গ্রাহককে পরিষ্কার ধারণা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমআরএর প্রকাশিত গণশুনানির তথ্যে ক্রমহ্রাসমান স্থিতি পদ্ধতিতে ২৪ শতাংশ সার্ভিস চার্জ এবং ১৫ দিনের গ্রেস পিরিয়ডসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক শর্তের উল্লেখ রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট ঋণ কর্মসূচিতে কোন শর্ত প্রযোজ্য হবে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ঋণপত্র ও পরিশোধ সূচি থেকে যাচাই করতে হবে।
জামানতবিহীন ঋণের সবচেয়ে বাস্তব ব্যবহার কী
জামানতবিহীন ঋণ সবচেয়ে কার্যকর হয় যখন ঋণের টাকা এমন কাজে যায় যেখান থেকে নিয়মিত আয় তৈরি হয়। যেমন ছোট দোকানের মালামাল বাড়ানো, সেলাইয়ের যন্ত্র কেনা, হাঁস-মুরগি বা গবাদিপশু পালন, কৃষি উৎপাদন, খাবার তৈরি, হস্তশিল্প অথবা চলমান ক্ষুদ্র ব্যবসার কার্যকরী মূলধন। শুধু দৈনন্দিন ভোগ ব্যয় মেটাতে ঋণ নিলে নতুন আয় তৈরি না হওয়ায় কিস্তি দেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
প্রশ্ন ও উত্তর
১. নারীরা কি সম্পত্তির দলিল ছাড়া এনজিও থেকে ঋণ পেতে পারেন?
হ্যাঁ, বেশ কিছু ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান প্রচলিত সম্পত্তিভিত্তিক জামানত ছাড়াই নারীদের ঋণ দিয়ে থাকে। তবে আবেদনকারীকে সদস্যপদ, পরিচয় যাচাই, সঞ্চয়, আয়বর্ধক কাজ এবং কিস্তি দেওয়ার সক্ষমতার মতো শর্ত পূরণ করতে হতে পারে। তাই জামানত না লাগাকে কোনো শর্তই লাগবে না বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
২. চাকরি না থাকলেও একজন নারী ঋণ নিতে পারবেন?
নিয়মিত চাকরি অনেক ক্ষুদ্রঋণের বাধ্যতামূলক শর্ত নয়। বরং ছোট ব্যবসা, কৃষি, পশুপালন, সেলাই বা অন্য কোনো আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রেও কিছু প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা যাচাই করে অর্থায়ন করতে পারে।
৩. ঋণ নেওয়ার জন্য স্বামীর অনুমতি বাধ্যতামূলক?
সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের জন্য এ বিষয়ে একই নিয়ম নেই। নারী আবেদনকারী নিজ নামে সদস্য ও ঋণগ্রহীতা হতে পারেন। তবে পরিচয়, ঠিকানা, পরিবার, নমিনি বা পরিবারের অন্য সদস্যের তথ্য আবেদন যাচাইয়ের অংশ হিসেবে চাওয়া হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত শর্ত দিলে আবেদন করার আগে সেটি তাদের বর্তমান লিখিত নীতির অংশ কি না যাচাই করা উচিত।
৪. এনজিও থেকে প্রথমবার কত টাকা ঋণ পাওয়া যায়?
প্রথম ঋণের জন্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কোনো একক অঙ্ক নেই। প্রতিষ্ঠান, ঋণ কর্মসূচি, প্রয়োজন, আয়বর্ধক কাজ এবং পরিশোধের সক্ষমতা অনুযায়ী পরিমাণ আলাদা হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে শক্তি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত জাগরণ ঋণের পরিমাণ ৩০ হাজার টাকা থেকে ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা পর্যন্ত। অন্য প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ও যোগ্যতার নিয়ম আলাদা হতে পারে।
৫. এনজিও ঋণের জন্য আগে সঞ্চয় করতে হয়?
কিছু কর্মসূচিতে সদস্য সঞ্চয়ের ব্যবস্থা থাকে এবং কিছু ক্ষেত্রে সদস্য হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয়। আবার সব প্রতিষ্ঠানের নিয়ম এক নয়। আবেদন করার সময় ঋণ পাওয়ার আগে কত টাকা সঞ্চয় করতে হবে এবং সেই টাকা কখন উত্তোলন করা যাবে তা লিখিতভাবে জানতে হবে।
৬. একই সময়ে একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া উচিত?
একাধিক ঋণের কিস্তি একসঙ্গে চললে পরিবারের নগদ অর্থের ওপর চাপ বেড়ে যেতে পারে। নতুন ঋণ দিয়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি দেওয়া শুরু হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। তাই নতুন ঋণ নেওয়ার আগে সব চলমান কিস্তির মোট মাসিক বা সাপ্তাহিক পরিমাণ হিসাব করা প্রয়োজন।
৭. ছোট ব্যবসা না থাকলে ঋণের আবেদন করা যাবে?
কিছু কর্মসূচি নতুন আয়বর্ধক উদ্যোগের জন্যও অর্থায়ন করতে পারে। তবে কী ব্যবসা করবেন, কত টাকা লাগবে, সম্ভাব্য বিক্রি কত এবং কিস্তির টাকা কোথা থেকে আসবে তার বাস্তব পরিকল্পনা থাকা দরকার। শুধু ঋণ পাওয়া উদ্দেশ্য না হয়ে অর্থ থেকে আয় তৈরি করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
৮. কোনো এনজিও বৈধ কি না কীভাবে বোঝা যাবে?
কোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটি এমআরএর সনদপ্রাপ্ত কি না দেখা গুরুত্বপূর্ণ। এমআরএ সনদপ্রাপ্ত ও সনদ বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করে এবং প্রতিষ্ঠান যাচাইয়ের জন্য ই-ভেরিফিকেশন সুবিধাও রয়েছে। ঋণের আবেদন বা কোনো টাকা জমা দেওয়ার আগে এই সরকারি তথ্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পরিচয় মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
৯. ঋণের কিস্তি ঠিক করার আগে কী হিসাব করা উচিত?
পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দেওয়ার পর নিয়মিত যে টাকা অবশিষ্ট থাকে তার সঙ্গে কিস্তির অঙ্ক তুলনা করতে হবে। ব্যবসার সবচেয়ে ভালো মাসের আয় ধরে হিসাব না করে কম বিক্রির মাসে যে আয় হয় সেটি ধরে পরিকল্পনা করা নিরাপদ। এতে আয় কমে গেলেও কিস্তি চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়।
১০. ঋণ নেওয়ার আগে একাধিক এনজিও কীভাবে তুলনা করবেন?
একাধিক সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের ঋণ তুলনা করার সময় ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ, সার্ভিস চার্জ, কিস্তির পরিমাণ ও সময়সূচি, সঞ্চয়ের নিয়ম, অতিরিক্ত ফি এবং আগাম পরিশোধের শর্ত দেখা যেতে পারে। নিজের আয় ও ব্যয়ের সঙ্গে কোন ঋণের কিস্তি সামঞ্জস্যপূর্ণ তা হিসাব করার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। শুধু প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি বা বেশি ঋণ পাওয়ার সুযোগকে সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি করা ঠিক নয়।
উপসংহার
বাংলাদেশে ব্র্যাক, শক্তি ফাউন্ডেশন, বুরো বাংলাদেশ ও পদক্ষেপের প্রকাশিত তথ্যে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণের উল্লেখ পাওয়া যায়। আশা, উদ্দীপন ও টিএমএসএসও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে, তবে এসব প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কর্মসূচির বর্তমান জামানত ও অন্যান্য শর্ত আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ঋণের নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে বলে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ লিখিত তথ্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ঋণের আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ, প্রতিষ্ঠানের এমআরএ সনদ যাচাই, মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ ও কিস্তির সময়সূচি বোঝা এবং নিজের পরিশোধ সক্ষমতা হিসাব করা গুরুত্বপূর্ণ। জামানত না লাগা একটি সুবিধা হতে পারে, তবে ঋণের সব শর্ত বুঝে এবং নিজের নিয়মিত আয়-ব্যয়ের সঙ্গে কিস্তির পরিমাণ মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

